সিলেট

অনিয়মের আঁতুড়ঘর সিলেট মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

Icon
সাকিব আল মামুন :

০৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অনিয়মের আঁতুড়ঘর সিলেট মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

সিলেট মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, হাজিরা এবং ভাতা বিতরণ পর্যন্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অর্থায়নে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে ড্রাইভিং উইথ মেকানিক্স কোর্সের ১৭তম ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী অফিস সহকারী শেখ মোহাম্মদ আজাদ ও প্রশিক্ষক আব্দুল কলিমের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন, প্রশিক্ষণে অব্যবস্থাপনা, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর হাজিরা, দুর্ব্যবহার এবং ভাতা আটকে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ- সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে বা নির্ধারিত নিয়মে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও ভর্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন করতে হচ্ছে। টাকা ছাড়া ভর্তি হাওয়া যেন দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেছেন- অফিস সহকারী শেখ মোহাম্মদ আজাদের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। জনপ্রতি ১৫০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। ভর্তি প্রক্রিয়ায় এমন অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সরকারি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাইম ইবনে আব্বাস দৈনিক সচিত্র সিলেটকে বলেন- ‘আমাকে ভর্তি হতে ১৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে ৭০০০ টাকা করে দেওয়ার কথা কিন্তু ৩৫০০ টাকা দিয়ে বাকি টাকা দেয়া হচ্ছে না। আমরা ১৭তম ব্যাচে ছিলাম, এখন ২০তম ব্যাচের প্রশিক্ষণ চলছে। এতোটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কোন সুরাহা নেই। তিনি বলেন, অফিস সহকারী আজাদ বারবার ‘আজ পাবেন, কাল পাবেন’ বলে সময় পার করছেন।’

শুধু ভর্তি নয়, ড্রাইভিং লাইসেন্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলেও অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

হাসান আহমদ নামের শিক্ষার্থী দৈনিক সচিত্র সিলেটকে বলেন- ‘যেখানে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা, সেখানে অর্থ ছাড়া কোন কাজ হয় না। ভর্তির পরেই ৪০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২৫০টাকা করে নেয়া হয়। ফাইনাল পরীক্ষার সময় ৪০০০ টাকা করে দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেন প্রশিক্ষকরা। পরে ৩৫০০টাকা করে দিতে বাধ্য হই আমরা।’

তিনি বলেন- ‘এসব বিষয়ে তারা নীরব থাকিনি। প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগও করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের কিছু না বলে আমাদেরকে শাষান।’ তিনি এসব বিষয়ে সুরাহা না করায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব অর্থ বাণিজ্যের সাথে তিনি জড়িত কি না তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ- ব্যবহারিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৪০ থেকে ৫০ মিনিটের মধ্যেই ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ শেষ করা হতো বলে দাবি তাদের। এতে একজন শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত সময় গাড়ি চালানোর সুযোগ না পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এছাড়াও প্রশিক্ষকের আচরণ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। এক নারী শিক্ষার্থী বলেন- গাড়ি চালানোর সময় কোনো শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে গালাগাল করা হতো। এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। প্রশিক্ষক আব্দুল কলিমের আচরণ নিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে তাদের মধ্যে। অনেক সময় নারী প্রশিক্ষনার্থীদের গায়ে হাত তোলা, অকথ্য ভাষায় গালাগাল, বেড টাচ করারও নজির আছে।

অন্যদিকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হাজিরা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ- তারা প্রশিক্ষণে উপস্থিত না থাকলেও হাজিরা খাতায় তাদের উপস্থিত দেখানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনিয়মের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে ব্যাচ থেকে বহিষ্কার কিংবা প্রশিক্ষণ থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দাবি জানিয়েছেন।

অফিস সহকারী শেখ মোহাম্মদ আজাদ, ‘আমি এই বিষয়ে কিছু জানিনা’ বলে সদুত্তর দিতে নানান টালবাহানা করতে থাকেন। তিনি বলেন ‘আমি এখানে স্কিল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করি। মাঝে মধ্যে ইন্সট্রাকটরদের সহযোগিতা করি,। কোন অভিযোগ থাকলে প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে কথা বলুন।’

প্রশিক্ষক আব্দুল কলিম বলেন, ‘আমি বর্তমানে এখানে নেই। চাকুরী ছেড়ে দিয়েছি। গালাগাল ও মারধরের বিষয়টি তিনি স্বীকার করে বলেন আমি পেশাদার ড্রাইভিং শেখাইছি। এখানে টুকটাক একটু গরম হইতে হয়। এই যে কায়দা আমরা এটাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করি। ক্লাশ শেষে আমরা আবার হাত মিলিয়ে নেই। কিছু শিক্ষার্থী উশৃঙ্খল থাকায় উল্টোপাল্টো অভিযোগ করছে। আমি চাকরিটা ছেড়ে চলে এসেছি।’

সিলেট মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আসিফ আজিজ দৈনিক সচিত্র সিলেট বলেন- প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হতে কোনো ফি লাগে না। অভিযোগগুলো সম্পুর্ণ ভিত্তিহীন।

শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- এটা আমরা দেখতেছি, তদন্ত কমিটি হয়েছে, তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেবে।