সাহিত্য
১৬ই জুলাই, ২০২৬
শরতের মেঘহীন আকাশে তখন হালকা রোদের ছটা। নিজের অন্ধকার ঘরটায় জানালার পাশে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন জামিল। পেশায় তিনি একজন জাঁদরেল সাংবাদিক। সমাজের অন্যায়-অবিচার নিয়ে যার কলম তলোয়ারের মতো চলে, সেই জামিল আজ নিজেই এক অদৃশ্য বেদনায় কুঁকড়ে আছেন। বয়স চল্লিশের কোঠায় ছোঁয়া জামিলের জীবনে প্রেম-ভালোবাসা কোনোদিন ওভাবে আসেনি, যতদিন না তার জীবনে তাহমিনার প্রবেশ ঘটেছিল।
তাহমিনা। এক উদীয়মান, তেজস্বী রাজনৈতিক নেত্রী। রূপ আর বক্তৃতার জাদুতে যিনি অল্প দিনেই রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছেন। একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারের সূত্রে জামিলের সাথে তার পরিচয়। সেই পরিচয় দ্রুত রূপ নেয় সখ্যতায়। দিনে দিনে কাজের খবরের চেয়ে ব্যক্তিগত ফোনালাপ আর মেসেজ আদান-প্রদানই তাদের জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
জামিল তাহমিনাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা তাহমিনার কণ্ঠস্বর জামিলের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিত। তাহমিনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের যেকোনো সংকটে জামিল ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নিজের সাংবাদিকতার প্রভাব খাটিয়ে একবার তাহমিনাকে বড় বিতর্ক থেকেও বাঁচিয়েছেন, পর্দার আড়াল থেকে দিয়েছেন সঠিক কৌশলগত পরামর্শ।
তাহমিনার একটু হাসির জন্য জামিল যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং কাজের মাধ্যমে তার অজস্র প্রমাণও তিনি দিয়েছিলেন।
তাহমিনাও বলতেন, ‘জামিল, ধন্যবাদ, তুমি আমার জন্য এতকিছু করছো।’
কিন্তু সময়ের সমীকরণ বড্ড জটিল।
হঠাৎ করেই একদিন তাহমিনার আচরণ বদলে যেতে শুরু করল। ফোনের ওপাশ থেকে সেই চেনা উষ্ণতা উধাও হয়ে গেল। মেসেজের উত্তর আসত ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর, কখনো বা শুধুই একটা ‘হুম’। জামিল ভাবতেন, হয়তো রাজনৈতিক ব্যস্ততা। কিন্তু ভুল ভাঙল যখন একদিন কোনো কারণ ছাড়াই তাহমিনা পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন।
কোনো ঝগড়া নয়, কোনো ভুল বোঝাবুঝি নয়, জাস্ট একটা নির্মম নীরবতা।
এই আকস্মিক প্রত্যাখ্যানে জামিল ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেন। যে মানুষটার জন্য তিনি নিজের সবকিছু বাজি রাখতে পারতেন, সে এভাবে তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিল? তীব্র কষ্টে জামিল নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নিলেন।
অফিসের কাজ, চেনা আড্ডা- সব যেন আজ পানসে।
কেটে গেল বেশ কিছুদিন। কোনো সাড়া না পেয়ে জামিল বুঝলেন, তাহমিনার জীবনে হয়তো নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যেখানে এই সাংবাদিকের আর কোনো প্রয়োজন নেই। নিজের আত্মসম্মান আর জমানো কষ্টের সবটুকু উজাড় করে জামিল তাহমিনাকে একটি শেষ মেসেজ লিখলেন-
‘আমি আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করতে আসবো না, তাহমিনা। তোমার রাজনৈতিক আকাশ আরও উজ্জ্বল হোক। তবে মনে রেখো, জীবনের কোনো ঝড়ে যদি কখনো আশ্রয় না পাও, তোমার জন্য আমার বুকের দুয়ার সবসময় খোলা রইল।’
মেসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিলেন জামিল। তিনি জানেন, এই মেসেজের কোনো উত্তর আসবে না।
মনে পড়ে, সম্পর্কে টানাপোড়েনের শেষের দিকে তাহমিনার কাছে জামিল শুধু একটি নির্জন বিকেল চেয়েছিলেন। শুধু তাদের দুজনের জন্য।
তাহমিনা বলেওছিলো- ‘হুম, পাবে।’
কিন্তু জামিল বেশ বুঝতে পারছে, অজস্র আকুলতার সেই বিকাল আর তার জীবনে আসবে না।
কিছু ভালোবাসা এমনই হয়—কোনো প্রতিদান না পেয়েও, অবহেলার শিকার হয়েও তা নিজের জায়গায় অটুট থাকে। জামিল আবার জানালার বাইরে তাকালেন; শূন্য আকাশে তখন একলা এক ঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে, ঠিক তার নিজের একাকী হৃদয়ের মতো।
(গল্পটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)