সাহিত্য
০৪ই মে, ২০২৬
আনিফ রুবেদ
একথা সত্য যে, মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর যেখানে শিশুকাল ও কৈশোরকাল কাটায়; সেখানের বাতাসের দাগ, জলের দাগ, মাটির দাগ, মানুষের চলনবলনের দাগ গভীরভাবে থেকে যায় মানুষটির মগজ এবং মাংসের কোষে কোষে; চোখের আলোর রসে। পরে ওই মানুষ পৃথিবীর যেখানেই থাক না কেন শিশুকাল কৈশোরকাল যেখানে কাটিয়েছেন; সেখানের ছাপ কোনোদিনই আর ওঠে না; এ ছাপ এমনই অমোচিনীয় যে, পরবর্তীতে তার জীবনের নানা কাজে-কর্মেও তার প্রভাব নির্ঘাত পড়ে। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের ক্ষেত্রে এ সত্য আরও সত্য।
‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বকবি হিসেবে খ্যাত, কিন্তু ভারতীয় বলে বিবেচিত। যদিও বঙ্গদেশে তাঁর জন্ম, জন্মসূত্রে বাঙালি, সাহিত্য সাধনা বাংলায়। তাঁর লেখনিতে আন্তর্জাতিকতা ও সর্বভারতীয় ছাপও বিদ্যমান। কিন্তু সব কিছু মিলে তিনি বাংলার কবি। বাংলার প্রতি মমত্ববোধ এবং দেশাত্মবোধের বলিষ্ঠ উদাহরণ স্বদেশ প্রেমের গান, কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধে চিরভাস্বর। কাজী নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি হিসেবে আখ্যায়িত করার ফলে প্রেম-বিরহ-রোমান্টিকতা ও স্বদেশের প্রতি যে বলিষ্ঠ অবদান কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে। জীবনানন্দ দাশ রোমান্টিক কবি হলেও জন্মস্থান বরিশালের নিসর্গ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মনলোভা চিত্র নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন, যা সত্যিকার অর্থে বাংলার চিরন্তন রূপ। শামসুর রাহমানের কবিতায় পুরান ঢাকা ও নরসিংদীর প্রতিফলন দেখা যায়। কবি আল মাহমুদ ছিলেন তিতাস প্রেমিক। তিতাস নদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জনপদের প্রসঙ্গ নানাভাবে স্থান পেয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটকে নিজ জেলা কুড়িগ্রাম এবং তিস্তা-ধরলা নদীপাড়ের জীবনগাঁথা নানাভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। অভিমানী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলাদেশকে ছেড়ে গেলেও জন্মভূমি বা নাড়ির কথা ভোলা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কপোতাক্ষ নদ নিয়ে যে কাব্যরচনা করেছেন তাতেই স্বদেশপ্রেম বলিষ্ঠভাবে প্রতীয়মান। তবে এটা ঠিক—একেক কবির মননের বিকাশ প্রবণতা একেক ধরনের এবং আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়। তবে শেকড়ের টান কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। মধুকবির পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কবিরা নিজ জন্মস্থানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তবে তা বৃহত্তর অর্থে আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে জাতীয় পরিচয়ে থিতু হয়। সেভাবেই উল্লেখিত কবিগণ সকলেই বাংলার কবি—বাংলাদেশের কবি এবং তাঁদের কাব্য সাধনায় বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।’১
উপর্যুক্ত উক্তিমালা থেকে আমরা সেই স্বতসিদ্ধ প্রমাণটিই পাই যে, জন্মস্থান এবং বেড়ে ওঠার স্থান সকল কবি-লেখকের মধ্যেই শক্তিশালী আঠার মতো, মধুর মিঠার মতো জড়িয়ে থাকে, ছড়িয়ে থাকে। বক্ষ্যমান নিবন্ধের আলোচ্য কবি আমিনুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। আসলে এর ব্যতিক্রম হবার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। কবি আমিনুল ইসলামের জন্ম এবং শৈশব-কৈশোর কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা-মহানন্দা-পাগলা বিধৌত সরস অঞ্চলে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের মানুষ ও মানুষের প্রকৃতি এবং প্রকৃতির প্রকৃতি ও ব্যবহার তার সাহিত্যে অত্যন্ত শক্তিশালী রেখায় আর গাঢ় আবহে ফুটে ওঠে।
‘গৌড়-বরেন্দ্রের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার অঙ্গীকার করেছেন কবি। লোকসম্পদে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের নিজস্ব লোকআঙ্গিক আলকাপ, গম্ভীরার সঙ্গে পুঁথিপাঠ, কবিগান, রাখালিয়া বাঁশি আর কিংবদন্তীর কথা বিভিন্ন প্রসঙ্গেই তাঁর কবিতায় মাঝেমধ্যেই ঘাঁই মারে। বরেন্দ্র’র কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী মানুষের অবসর বিনোদনের মাধ্যম এসব লোকসংগীত বিশেষ করে আলকাপ ও গম্ভীরা দুই জনপ্রিয় লোকআঙ্গিক। দলগত পরিবেশনায় এইসব মানুষই সাজে কবি-অভিনেতা দলপতি সরকার। আলকাপ গান, গম্ভীরার সরকার, পুঁথিপাঠ, পৌষমেলা, কবিগানের প্রবাদপুরুষ গুমানি এইসব বিষয় প্রায়শই স্মৃতিবাহিত হয়ে উঠে আসে আমিনুল ইসলামের কবিতায়।
বাংলার জলময় ভূগোলে বরেন্দ্র অনেকখানি রুক্ষ। প্রকৃতির এই রুক্ষতাই বাড়িয়ে দেয় নদীতৃষ্ণা। বরেন্দ্রে খুব বেশি নদী নেই। উল্লেখযোগ্য সমস্ত নদীকেই পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়: পদ্মা, আত্রাই, মহানন্দা, পুনর্ভবা, করতোয়া, তিস্তা । জলজীয়া প্রাণ কবির একটি কাব্যের নাম ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’। নাম কবিতায় কবি ‘মহানন্দাকে প্রাণের দোসর বানিয়েছেন’ ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে তাকে বর্ণনা করেছেন। সেই নদীসূত্রে এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্য আম, কাঁসা, রেশম প্রভৃতির কথা। স্বর্গের অলকানন্দার সঙ্গে তুলনা করেছেন বরেন্দ্রের মহানন্দাকে; অতীত ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করে কবি লিখেছেন।’২
কবি আমিনুল ইসলাম নিজেও তার নিজস্ব মাটিমগ্নতা, মাটিলগ্নতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পদ্মা-মহানন্দা-পাগলা-পাঙ্গাশমারী-বিধৌত চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিসমৃদ্ধ চরাঞ্চলে আমার জন্ম। যতদূর মনে পড়ে শিশুকাল হতেই আমি বৃষ্টি ও নদীর অক্লান্ত ভক্ত। বৃষ্টি হলে আমাকে ঘরে বেঁধে রাখবে এমন সাধ্য কারুরই ছিল না। বাস্তবিকই বৃষ্টির নূপুর বেজে ওঠার সাথে সাথে আমার হৃদয়মন ময়ূরের মতো নেচে উঠতো। আর বৃষ্টিমুখর নদীতে দলবলে সাঁতার কাটায় যে আনন্দলাভ ঘটত, পরবর্তী সময়ে মহার্ঘ্য আর কোন কিছুতেই তা জোটেনি। যে কোনো অর্থেই আমি জলের সন্তান—কোনো জনমে জলদাস ছিলাম কি না জানি না। নদী আমার জন্মদাত্রী থেকে খেলার সাথি হয়ে প্রথম যৌবনে প্রেমিকার স্থান দখল করে। ভরাবর্ষায় আমি তরঙ্গায়িত পাঙ্গাশমারীর বুকে গাঙচিলের মতো ঝাঁপ দিতাম আর স্রোত ও ঢেউয়ের দোলায় ভেসে যেতাম দায়হীন আনন্দে—অবারিত অগন্তব্যে। বহুবার নাকানিচুবানি খেয়েছি, তবে কখনো সে আমাকে মাঝগাঙে ডুবিয়ে মারেনি। আমার শৈশব, আমার কৈশোরের মধুর দিনগুলো, আমার যৌবনের বড় অংশ কেটেছে নদীবিধৌত প্রকৃতির উদার অবাধ প্রাঙ্গণে। পরবর্তীতে আমাদের ভিটামাটি জমিজমা সব গেছে সেই নদীর পেটে। পদ্মানদীর গ্রাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আমার জন্মগ্রাম টিকলীচরসহ ওই এলাকার ৪-৫টি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম—মাঠ-ঘাট-হাট-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমাদের এলাকার মানুষ ছিন্নভিন্ন হয়ে যে যেখানে পেরেছেন, চলে গেছেন। কেউ নতুন চরে, কেউ শহরে, কেউ রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে, কেউবা আরও দূরের কোনো জেলায়। আমার এবং তাদের সবার বুকে নিত্য শেকড়বিচ্যুত হওয়ার যন্ত্রণা। ভিটেমাটিহারা দীর্ঘশ্বাস মাঝে মাঝে আমাকেও ভীষণভাবে স্পর্শ করে। ফারাক্কাবাঁধের অভিশাপে সে নদী এখন ধূ ধূ বালুচর। কিন্তু আমার জাগরণে এবং স্বপ্নে এখনো সেই গ্রাম, সেই মাঠ, সেই নদী, সেই কৈশোর, সেই স্কুল প্রবলভাবে অস্তিত্বশীল।’ (আমার কবিতা: কাছের কেন্দ্র—দূরের পরিধি/ কবিতাসমগ্র-এর ভূমিকা)।