সাহিত্য
১৮ই জুন, ২০২৬
প্রতিটি মানুষের যেকোন কাজে সফল বা প্রতিষ্টিত বা পরিচিত হওয়ার পেছনের একটা গল্প থাকে। সেই গল্পটা স্মৃতিতে থাকে অমলিন। আমরা লিখালিখির জগতের মানুষ। এই জগতে আসার পিছনেও থাকে একটি ইতিহাস।
লিখালিখির বিভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে। যেমনঃ গল্প, কবিতা, ছড়া, নাটক, উপন্যাস, কলাম, প্রবন্ধ, গবেষণা, গান ইত্যাদি। আমি আমার এই চল্লিশ উর্দ্ধ জীবনে নাটক ও উপন্যাস ছাড়া বাকী সবগুলো কাজ করার চেষ্টা করেছি। অদ্যবধি এই পথে অনেক কাজ চলমান। অনেক রাত নির্ঘুম হয় শুধুমাত্র লিখা ও তার শিরোনাম ভাবনায়।
আমি মফস্বলে বেড়ে উঠা একজন মানুষ। বিগত শতকে আমার জন্ম সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়। আমার শৈশবটা কেটেছে পড়ালেখা ও খেলাধুলায়। ছোটবেলা থেকেই আমার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল। আমাদের পরিবার সেই সময় থেকে খবর সচেতন একটি পরিবার। অনেক শিক্ষিত পরিবারে সেই সময় মাত্র ৫ টাকার ভয়ে যেখানে পত্রিকা যেত না, সেখানে আমাদের ঘরে প্রতিদিন কমপক্ষে ২ টি জাতীয় পত্রিকা ও একটি স্থানীয় পত্রিকা আসতো। কমপক্ষে এজন্য বললাম-কোনদিন এর চেয়ে বেশীও পত্রিকা আসতো। ছোটবেলা আমরা একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়েছি, যে পরিবারগুলো বর্তমান যুগে অনেকটা স্বপ্নের মতো। এই পরিবারগুলোতে অনেক গেঞ্জাম থাকে ঠিকই, তবে অনেক আন্তরিকতাও থাকে। অনেক শেখা যায়, দেখা যায়। যাই হোক, এই একান্নবর্তী পরিবারে ছোটবেলা কেটে যাওয়ার কারনে অনেকগুলো পত্রিকা পড়ার সৌভাগ্য হয়ে যেতো। আমি তখন থেকেই পত্রিকা পড়ূয়া মানুষ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় হতেই পত্রিকা দেখা ও কিছু কিছু পড়া শুরু। তখনকার সময়ে ঈদ এলে ঈদসংখ্যার প্রতি ছিল আমাদের আলাদা একটি কৌতুহল। ঈদ সংখ্যায় প্রচুর গল্প কবিতা পড়তাম। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে আমি বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কিছু ইভেন্টে সবসময় পুরষ্কার পেতাম। ইভেন্টগুলো হলো-অঙ্ক দৌড়, সাধারন জ্ঞান, উপস্থিত বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি, রবীন্দ্র সংগীত ও দেশাত্মবোধক গান। এসবে বিজয়ী হিসাবে আমাকে বই দেওয়া হতো। সেই সময় বই পুরষ্কার পাওয়া আমার জন্য অনেক আনন্দের ছিল। আমি সেই বইগুলো ঘরে এনে প্রথমে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতাম এবং তারপর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়া শেষ করতাম। অনেকগুলো বই স্কুল জীবনে পড়েছি। তখন সেগুলো পড়ে এক ধরনের স্বর্গীয় সুখ অনুভুব করতাম। নবম-দশম শ্রেণীতে অধয়নকালীন সময় থেকেই পত্রিকার ভিতরের পাতার কলামের দিকে আমার চোখ বুলানো শুরু। ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন সময়ে পত্রিকার কলামের পুরোপুরি পাঠক হয়ে যাই। তখন প্রথম আলো পত্রিকাটি সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। তখন প্রথম আলো পত্রিকায় দেশ সেরা কলামিস্টরা কলাম লিখতেন। আমি কয়েকজনের লিখা প্রায় নিয়মিতই পড়তাম। কয়েকজনের কলাম শুধু পড়তেই ইচ্ছে করতো।
পড়তে পড়তে একসময় একটি কলাম লিখেই ফেললাম। সিলেট শহরে আমি তখন একটি মেসে থাকতাম। মেসটি শহরের টিলাগড় এলাকায় ছিল। আমি তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বিষয় ছিল একাউন্টিং। সিলেটের মদন মোহন কলেজের তারাপুর ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিলাম আমি। এখানেই অনার্স এবং মাস্টার্স সুসম্পন্ন করেছি।
যাই হোক, আমি তখন একটি কলাম লিখতে বসেই গেলাম। তখন ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসন চলছে। আমি এই বিষয়টা মাথায় নিয়ে লিখা শুরু করলাম। প্রায় ৩ দিনে লিখা শেষ করলাম এবং লিখা শেষে লিখাটির শিরোনাম দিলাম-"বিশ্ববাসীর প্রত্যাশার হোক-২০০৩"। লিখা শেষ, এখন পত্রিকা অফিসে জমা দেওয়ার পালা। তখন হাতে লিখার যুগ ছিল। আমার তখন একটি বাটন ফোনও ছিল না। অবশেষে পত্রিকায় জমা দেওয়ার জন্য পত্রিকা নির্ধারন করলাম। পত্রিকাটির নাম-দৈনিক শ্যামল সিলেট। আমি দৈনিক শ্যামল সিলেটের মিরাবাজার কার্যালয়ে ঐদিন বিকেলের দিকে নিয়ে আমার জীবনের প্রথম হাতে লিখা কলামটি জমা দিলাম। পত্রিকা অফিসে কর্তব্যরত কোন একজন আমার লিখাটি জমা রাখলেন। পরদিন সকালে টিলাগড় পয়েন্টে একটি লাইব্ররীতে যাই এবং কৌতহল বশত শ্যামল সিলেট পত্রিকাটি হাতে নেই এবং সরাসরি পত্রিকাটির দ্বিতীয় পাতায় চলে যাই। দ্বিতীয় পাতার লিড শিরোনামে বড় করে লিখা দেখলাম--"বিশ্ববাসীর প্রত্যাশার হোক-২০০৩"। তারিখটা ২০০৩ সালের জানুয়ারী মাসের ১/২ তারিখ হবে। লিখাটি দেখে আমার অবাক হওয়ার মত অবস্থা। তখন আমার মনে হচ্ছিলো, আমার লিখা কলামটি পত্রিকার পাতায় স্বপ্নে দেখছি কি না! মেসে এসে সবাইকে দেখালাম এবং সবাই আমাকে কথা বলে প্রেরণা দিলো। ঐদিন কিছু সময় পরপর কলামটি শুধু পত্রিকার পাতায় দেখছিলাম এবং আনন্দ পেয়েছিলাম। সেই থেকে আমার কলাম লিখা যে শুরু হয়েছিল, তা আর থেমে থাকেনি। আমি আমার ছাত্র জীবনে সিলেটের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রায় অর্ধ শতাধিক কলাম লিখেছি। সবচেয়ে গর্বের বিষয় আমি যা লিখতাম তার সব লিখা ছিল মৌলিক। কপি পেস্টের কোন ধান্দা আমার মাথায় কখনই ছিল না। আর সেই সময়ের কলাম লিখার সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো--আমার লিখা এমন কোন কলাম নেই, যেটি পত্রিকায় তখন ছাপা হয়নি। আমি যা'ই দিতাম, তাই পত্রিকায় ছাপা হতো। আমি সেই সময়েই যেন পুরোপুরি একজন কলামিস্ট হয়ে গেলাম। তবে এই লিখালিখির ধান্দায় পড়ায় কিছুটা আমি ক্ষতিগ্রস্থ যে হয়নি, তা'ও কিন্তু অস্বীকার করা যায়না। লিখালিখি একটি চিন্তাশীল জগৎ। তাই আমি কোথাও হাটলে, হঠাৎ আমি লিখার কোন টপিকস নিয়ে চিন্তায় চলে যেতাম এবং এই টপিকসটা নিয়ে লিখালিখিতে বসে যেতাম। নিয়োগ পরীক্ষার গাইড কিছু পড়ে আবার লিখালিখির ভাবনায় চলে যেতাম এবং লিখতে বসে পড়তাম। এতে গিয়ে পড়াশোনায় ব্যাঘাত হতো। আমার বিশ্বাস, আমার এই চিন্তাশীল মননের কারনে আমার জীবনে আমি আমার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছুতে পারিনি এবং ভালো চাকরী বাকরিও আমার হয়নি। আর এটাই সত্য।
যাই হোক, ২০১০ সাল পর্যন্ত আমি সিলেটের সবকটি দৈনিক পত্রিকার একজন নিয়মিত কলামিস্ট ছিলাম। তারপর কর্মজীবন শুরু। কর্ম ব্যাস্ততার কারনে কলাম লিখায ইতি টানি এবং মাঝে মাঝে কিছু ছড়া কবিতা লিখার চেষ্টা। যে চেষ্টা এখনো চলমান।
পরিশেষে বলবো, লিখালিখি একটি ধ্যানের জগৎ। আপনি তত লিখতে পারবেন। আপনি যত একা থেকে চিন্তা করবেন, আপনি তত বেশী লিখতে পারবেন। একজন সুখী মানুষের চেয়ে একজন কষ্টের মানুষ লিখতে পারে বেশী। লিখতে হলে মেধা ও চোখকে উন্নত জীবন দর্শনে উদ্বোদ্ধ করতে হবে। তবেই আপনি সত্যিকারের লেখক হয়ে উঠবেন। পৃথিবীটা সুন্দর হতে হলে এই জগৎটাতে কিছু ভালো মানুষের প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস--প্রজন্মের পর প্রজন্মের ছোট একটি অংশ ঐতিহ্যের ধারবাহিকতায় এই পথেই হাটবে। সবশেষে অনুরোধ, প্রচুর বই কিনুন, বই পড়ুন এবং কল্যাণকামী লিখা জাতিকে উপহার দিন।
লেখক : সাহিত্য অনুরাগী
আপলোড : আব্দুল খালিক