সিলেট
০৮ই জুন, ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। যত দ্রুত সম্ভব রায় কার্যকর চাই।’
ঢাকার রামিসার মতো একইভাবে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে সিলেটের চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার। সে সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে। গত ৬ মে মায়ের কাছ থেকে ১০ টাকা নিয়ে বিস্কুট কিনতে গিয়েছিলো ফাহিমা। ওইসময় প্রতিবেশী মাদকাসক্ত পাষণ্ড চাচা তাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করে। অভিযুক্ত যুববেকর নাম জাকির হোসেন। ঘটনার একদিন পর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
ফাহিমার বাবা সিলেটের জালালাবাদ থানায় বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
পুলিশ বলছে- মামলার তদন্তকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা থেকে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আসার কথা রয়েছে। এ রিপোর্ট হাতে পেলেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জালালাবাদ থানার তদন্ত কর্মকর্তা এস.আই মো. নুর উদ্দিন গতকাল সন্ধ্যায় সচিত্র সিলেটকে বলেন- ‘ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টের জন্য আমি গত সপ্তাহে ৪-৫ দিন ঢাকায় ছিলাম, যাতে দ্রুত রিপোর্টটি নিয়ে আসা যায়। দু-একদিনের মধ্যে আবারও ঢাকা যাবো। আশা করছি- এক সপ্তাহের মধ্যেই রিপোর্ট পেয়ে যাবো হাতে। এটি পেয়ে গেলেই আমরা প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবো। ইতোমধ্যে মামলার একটি শুনানি হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- ‘ময়না তদন্তের রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। এছাড়া তদন্তে আরও অনেক বিষয় উঠে আসছে। আইনি বাধ্য-বাধকতায় সব বলা যাচ্ছে না এখন।’
গ্রেফতারকৃত জাকির ছাড়াও এ ঘটনায় আরও অনেকে ফেঁসে যাবেন বলে পুলিশ সূত্র সচিত্র সিলেটকে জানায়।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও এ মামলার বাদীপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট গোলাম ইয়াহইয়া চৌধুরী (সুহেল) সচিত্র সিলেটকে বলেন- পুলিশ সব প্রমাণাদি আদালতে পেশ করলেই আমরা চেষ্টা করবো যত দ্রুত সম্ভব বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করতে। এ লক্ষ্যে বিজ্ঞ আদালতে আবেদন জানাবো আমরা। আশা করছি- রামিসার মতোই এ বিচারকার্যও দ্রুত শেষ হবে।
ফাহিমার মৃত্যুশোক যেন শেষই হচ্ছে না পরিবারে :
গত ৮ মে (শুক্রবার) বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুদিন আগে (৬ মে) সে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলো। এরপর সোমবার (১১ মে) রাতে ফাহিমাকে যৌন নির্যাতন ও হত্যাকারী তার প্রতিবেশী চাচা জাকির হোসেনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয় সে। বর্ণনা করে ঘটনার লোমহর্ষকতা।
সে জানায়- শিশু ফাহিমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করেছে। এ সময় জাকিরের বাড়িতে কেউ ছিলেন না। নির্যাতন সইতে না পেরে ফাহিমা অজ্ঞান হয়ে যায়। অপরাধ ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ফাহিমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে জাকির। এরপর স্ত্রীর ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে কচি নিথর দেহটি ব্যাগে রাখে সে। পরে ওড়নাসহ ফাহিমার মরদেহ বাড়ির পাশের একটি পুকুরপাড়ের ডোবায় ফেলে দেয় জাকির।
৫ ভাই-বোনের মধ্যে ফাহিমা ছিল চতুর্থ। তার বড় বোন ফাইজা বেগমের বয়স ১৪ বছর, ফারজানার বয়স ১০ বছর, ভাই রিহাদের বয়স ৯ বছর ও রিফাতের ১৩ মাস। আদরের মেয়েকে হারিয়ে তাদের বাবা রাইসুল হক ও মা রুবিনা বেগম হয়ে গেছেন স্তব্ধ। শোকে পাথর।
বড় বোন ফাইজা বেগম জানান- আমার বোনটা অনেক আদরের ছিল। ওরে আমি গোসল করিয়েছি। নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দিয়েছি। আমার সঙ্গে খেলা করেছে, আমার সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমিয়েছে। আমার এত মায়ার বোনটাকে কিভাবে মারলো এই পাষণ্ড। আমার বোনটাকে যেভাবে হত্যা করেছে এভাবে তারও মৃত্যু চাই। তার ফাঁসি চাই।
আদরের মেয়ে ফাহিমাকে হারিয়ে আহাজারি করতে করতে এখন অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন রুবিনা বেগম। তার শুধু একটাই কথা- ঘাতক জাকিরের ফাঁসি চাই।