সিলেট

‘জামাতা’ প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা

Icon
নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ই মে, ২০২৬

‘জামাতা’ প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা

তারেক রহমান। সিলেটের জামাতা, আঞ্চলিকতায় ‘দামান’। তরুণ প্রজন্মের দুলাভাই...

  • রেজাউল হক ডালিম

তারেক রহমান। সিলেটের জামাতা, আঞ্চলিকতায় ‘দামান’। তরুণ প্রজন্মের দুলাভাই। ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। বঙ্গভবনের চার দেয়ালে আবদ্ধ না থেকে ইতিহাস গড়ে দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় জনগণের সামনে উন্মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। জনগণের বহুল প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক এই সরকারের আজ ৭৩ দিন। এখনো ৩ মাস পূর্ণ হয়নি। সাবেক সফল রাষ্ট্রপতি শহিদ জিয়াউর রহমান ও আপসহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার গর্বিত সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এরই মধ্যে রাষ্ট্র মেরামত ও সুখি-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে অর্ধশতাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তবে দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত সিলেটের মানুষের বক্তব্য- এই আড়াই মাসে প্রত্যাশা অনুযায়ী এ অঞ্চলের প্রাপ্তি ঘটেনি সরকারের কাছ থেকে। সিলেট আগের মতোই উন্নয়নবঞ্চিত রয়ে গেছে। অন্ততঃ ‘জামাতা’ কিংবা ‘দুলাভাই’ হিসেবে প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে সিলেটকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন উপহার দিবেন প্রধানমন্ত্রী- এটিই এ অঞ্চলের মানুষের জোর দাবি এবং প্রত্যাশা।

সিলেট-ঢাকা ৬ লেনের কাজে ধীরগতি :
ঢাকা-সিলেট (কাঁচপুর-সিলেট) মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান। তবে মেঘা এ প্রকল্পের গতি কিছুটা ধীর। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রায় ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিলো ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন- এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ২০-২৫ ভাগ। শেষ হতে ২০২৮ সাল পেরিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ জটিলতাই কাজের ধীরগতির প্রধান কারণ। বার বার নকশা পরিবর্তনেও কাজে বিলম্ব হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বেড়েছে জনদুর্ভোগ। ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় সিলেটের মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের কাজে সৃষ্টি হয়েছে প্রতিবন্ধকা। পড়েছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে।

যাতায়াত ব্যবস্থা খারাপ থাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সিলেটে বর্তমানে দেশি-বিদেশি পর্যটক সমাগম কম। ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সিলেট। সেই লুকসানের প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

এছাড়া ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলাবাসীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এই মহাসড়ক। ফলে ৬ লেনের কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলবাসী।

চরম অবহেলার নীরব সাক্ষী সিলেট-ঢাকা রেলপথ :
জরাজীর্ণ ও চরম অবহেলার এক নীরব সাক্ষী সিলেট-ঢাকা রেলপথ। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন এ লাইনে গত ৫৫ বছরেও উন্নয়ন হয়নি। নানা সময়ে প্রতিশ্রুতির পরও থমকে আছে সিলেট-আখাউড়া ডুয়েল গেজ রেলপথ প্রকল্পের কাজ। বিগত সময়ে সিলেটের মন্ত্রী-এমপিদের প্রচেষ্টায়ও শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। জরাজীর্ণ রেল লাইনে ঝুঁকি নিয়েই ছুটে চলে ট্রেন। মাঝে-মধ্যেই ঘটে বড় দুর্ঘটনা। ঘটে প্রাণহানি।

এই পথের কমপক্ষে ২১টি ব্রিজ অনেক আগেই রেলওয়ের খাতায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এ অবস্থায় সিলেট-ঢাকা যাতায়াতে সময় লাগছে বেশি। এছাড়া গত এক যুগেও ঢাকা-সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে কোনো নতুন ট্রেন চালু করা হয়নি। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথেও কোনো ট্রেন চালু করারও উদ্যোগ নেই।

সর্বশেষ ২০১২ সালে সিলেট-ঢাকা রেলপথে কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন চালু হয়। এরপর ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো নতুন ট্রেন চালু করা হয়নি। সিলেট-ঢাকা রেলপথে বর্তমানে পারাবত, কালনী এবং এক রেকার দিয়ে নাম পরিবর্তন করে জয়ন্তিকা ও উপবন এক্সপ্রেস চলাচল করে। সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে উদয়ন ও পাহাড়িকা ট্রেন চলাচল করে। দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় বিভাগীয় নগরী সিলেটে ট্রেনের সংখ্যা একেবারেই কম।

ফলে সিলেট-ঢাকা, সিলেট-কক্সবাজার রেলপথে দুটি স্পেশাল ট্রেন চালু, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ সংস্কার ও ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনে উন্নীতকরণসহ আট দফা দাবি বৃহত্তর সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের। এই দাবিগুলো আদায়ে বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন ব্যানারে আন্দোলনও হয়েছে। তবু সিলেটবাসীর এই দাবিগুলো যেন ‘অরণ্যে রোদন’।

সিলেটবাসীর দাবি- অবিলম্বে সিলেট-ঢাকা, সিলেট-কক্সবাজার রেলপথে দুটি স্পেশাল ট্রেন চালু, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ সংস্কার ও ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীতকরণ, আখাউড়া-সিলেট সেকশনে অন্তত একটি লোকাল ট্রেন চালু, আখাউড়া-সিলেট সেকশনে সব বন্ধ স্টেশন চালুকরণ, কুলাউড়া জংশন স্টেশনে বরাদ্দকৃত আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, সিলেট-ঢাকাগামী আন্তঃনগর কালনী ও পারাবত ট্রেনের আজমপুরের পর ঢাকা অভিমুখী সব স্টেশনের যাত্রাবিরতি প্রত্যাহার, সিলেটের সাথে চলাচলকারী ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় রোধে ত্রুটিমুক্ত ইঞ্জিন রেখে ভালো ইঞ্জিল যুক্ত করে যাত্রীদের চাহিদা অনুপাতে প্রতিটি ট্রেনে অতিরিক্ত বগি সংযোজন করা।

সিলেটবাসী বলছেন- ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সিলেট-আখাউড়া রেলপথে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। সব সরকারের আমলেই রেলপথটি বৈষম্যের শিকার। গত একবছরে ঢাকা-সিলেট রেলপথ থেকে সরকার তৃতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আয় করেছে। কিন্ত রেলের উন্নয়নে বাস্তব কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ রেলপথ উন্নত হলে সিলেট এগিয়ে যাবে অর্থনৈতিকভাবে। লাভবান হবে সরকারও।

অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা : 
সিলেট একটি বিভাগীয় শহর। কোটিরও অধিক মানুষের ছোট্ট একটি বিষফোঁড়ার চিকিৎসা থেকে শুরু করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও অসহায় ও অসচ্ছল রোগীদের একমাত্র ভরসা সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এ বিভাগের সবচেয়ে বড় এই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত হলেও নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রোগীরাও আসেন এখানে চিকিৎসা নিতে। সবমিলিয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের ভরসার জায়গা এই হাসপাতাল। কিন্তু ৫০০ শয্যার জনবল দিয়ে ৯০০ শয্যার হাসপাতালটি চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এর বাইরে কয়েক হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন। এতে করে রোগী ও রোগীর স্বজনদের চাপ সামলাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে দায়িত্বশীলদের। অপরদিকে, রোগীরা পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত সেবা।

এ অবস্থায় ওসমানীকে অন্তত ২ হাজার শয্যায় উন্নীতকরণ চান সিলেটবাসী। এছাড়া বিভাগরে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০০ শয্যাবিশিষ্ট করলে চাপ কমবে ওসমানীতে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ চান সিলেটের মানুষ। কারণ- দেশের ফেরার পূর্বে লন্ডনে দেওয়া তারেক রহমানের এক বক্তব্যে ফুটে উঠেছিলো সিলেটের চিকিৎসাব্যবস্থার বেহালতার বিষয়টি। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও আশ্বাস প্রদান করেন সেই বক্তব্যে। এবার সময়- সেই আশ্বাস বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে সিলেটবাসীর স্বপ্ন পূরণের।

এদিকে, নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহ্যবাহী সিলেট মহানগরের চৌহাট্টা এলাকায় আবু সিনা ছাত্রাবাস ভেঙে নির্মাণ করা হয় জেলা হাসপাতাল। প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে  ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালের নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে শেষ হলেও এখন এটির দায়িত্ব নেয়নি না কেউ।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্টদের মতামত না নিয়ে এটি স্থাপনা নির্মাণ করায় এই হাসপাতাল ভবনের দায়িত্ব নিতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা। ফলে হাসপাতাল কমপ্লেক্স বুঝিয়ে দেয়ার মতো কর্তৃপক্ষ পাচ্ছে না গণপূর্ত বিভাগ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন- এটি চালু হলে ওসমানী হাসপাতালের উপর চাপ কমবে। সিলেট অঞ্চলের রোগীরা এখান থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা নিতে পারবেন।

এছাড়া সিলেটের সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই রয়েছে লোকবল ও ওষুধ সংকট। এসব দূর না করলে সিলেটবাসী যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবেন।

সিলেটকে বন্যা থেকে বাঁচানোর একমাত্র পথ নদী খনন :
ভারত থেকে স্রোতস্বীনি বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার আমলশীদ এসে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। এরপর সুরমা-কুশিয়ারা নামধারণ করে বয়ে চলেছে দুইদিকে। কখনো নদী দুটি সীমান্ত নদী হিসেবে, আবার কখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বর্ষায় ফুলেফেঁপে উঠা নদী দুটির পানি হয় সিলেটে বন্যার কারণ। আবার  শীতমৌসুমে তলানিতে ঠেকে সেই পানি।

সিলেটের প্রধান এই দুই নদীর সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও নদীগুোতে নাব্যতা ফেরাতে খননকাজের জন্য ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করেছিলো পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এছাড়া ২০২৩ সালে সিলেট বিভাগীয় নগরীসহ সিলেট জেলার ১৩ উপজেলাকে স্থায়ীভাবে বন্যা মুক্ত রাখতে  সিলেটের প্রধান নদী  সুরমা ও কুশিয়ারা খনন, নদী ভাঙনরোধ, কৃষিজমির চাষ বৃদ্ধি, মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি সর্বপোরি এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ‘সিলেট জেলার সুরমা-কুশিয়রা নদীর অববাহিকায় সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন’ নামের এ প্রকল্পটি  বাস্তবায়ন করতে সম্ভাব্য ব্যয় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। কিন্তু এসব প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে শুষ্ক মৌসুম শেষে বৃষ্টি শুরু হলেই সিলেটবাসীর মাঝে দেখা দেয় আতঙ্ক। বিগত বছরগুলোতে টানা ৩-৪ বার করে বন্যার কবলে পড়তে হয়েছে সিলেটের মানুষকে। ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকার। ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। এছাড়া বন্যা পরবর্তী সময়ে করতে হয়েেছে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোগত ব্যাপক সংস্কার। এতে সরকারের খরচ হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

যদিও বর্তমান সরকার নদ-নদী খননে গুরুত্বারূপ করেছেন। তবে সিলেটকে বন্যার ভয়ালতা থেকে বাঁচাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তত সুরমা ও কুশিয়ার এই দুটি নদী খনন করে নাব্যতা ফেরানো জরুরি।

অপরদিকে, এই দুটি নদীর পাড় ভাঙনেও ক্ষতিগ্রস্ত তীরবর্তী মানুষ। অনেকেই ভিটেমাটি হাারিয়ে সহায়-সম্বলহীন। নদীভাঙনের এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সিলেটবাসীর জোর দাবি।

সিলেটের পর্যটন শিল্পের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে উন্মোচিত হবে নতুন সম্ভাবনার দ্বার :
সিলেটের পর্যটন শিল্পকে গতানুগতিক ধারা থেকে বের করে আরও উন্নত ও পর্যটনমুখী করতে মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছিলো গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু বিষয়টি ছিলো ‘প্ল্যান’ পর্যন্তই।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা সিলেটের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই হাজারও ভ্রমণপিপাসু ছুটে আসেন এসব অনিন্দ্য সুন্দর স্থানগুলো ঘুরে দেখতে। তবে সাদাপাথর লুটকাণ্ডের পর পর্যটন খাতের নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোকে ইকো ফ্রেন্ডলি করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন সিলেটবাসী। সে দাবি পূরণে এবার পদক্ষেপ নিবে তারেক রহমান সরকার- এমনই প্রত্যাশা সিলেটবাসীর। 

গত সকারের আমলে বিছানাকান্দি, সাদাপাথর, জাফলং, উৎমাছড়া, লালাখাল, রাতাগুলসহ জেলার ছয়টি পর্যটন স্পট ও এর পরিবেশ রক্ষায় মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। ওই সময় জেলা প্রশাসন জানায়- ‘বিছানাকান্দি, রাতারগুলসহ এখানে সিলেটে আমাদের যে পর্যটন স্পটগুলো আছে, এ স্পটগুলোকে কেমনে আরও সাসটেইনএবল ওয়েতে আরও বড় ধরনের ইকো ট্যুরিজম স্পট করা যায় সেজন্য প্ল্যানিং চলছে। এ প্রজেক্টে নেদারল্যান্ডস সরকার ফান্ডিং করবে।’

ওই মাস্টারপ্ল্যানের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা এবং পরিবেশ ও স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ১৩ সদস্যের কমিটি।

সিলেট তথা সারা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা যেন না হয়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সে দিকে নজর দেয়ার অনুরোধ এ অঞ্চলের মানুষের।

শতভাগ পূর্ণাঙ্গতা পায়নি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর :
সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে ‘আন্তর্জাতিক’ ঘোষণা করা হলেও এখনো বেশ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত না হওয়ায় এখনই এটি শতভাগ পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। বিভিন্ন  সূত্র বলছে- শতভাগ পূর্ণতার ক্ষেত্রে বিলম্বের মূল কারণ কাজের দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি। পাশাপাশি সিলেটের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণও এর জন্য অনেকটা দায়ি। বিদেশি এয়ারলাইনস সিলেটে উঠা-নামার সব সুযোগ থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে- ঢাকায় বসা সিভিল অ্যাভিয়েশন ও বিমান বাংলাদেশের অসাধু কর্মকর্তাদের আপত্তির কারণেই তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে পিছিয়ে থাকছে সিলেট এয়ারপোর্ট।

১৯৪৪ সালে সিলেট বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর আতাউল গনি ওসমানীর সম্মানে নামকরণ করা হয় সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর। ২০০২ সালে ওসমানী বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হয়। যুক্তরাজ্য প্রবাসী সিলেটবাসীর দীর্ঘ আন্দোলনের পর লন্ডন-সিলেট রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। অনেকবার এই ফ্লাইট বন্ধও হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নাম থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বিমানের সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় সিলেটবাসীর মধ্যে হতাশা ছিল। আবার আন্দোলন করার পর চালু হয়।

২০১০ সালে তৎক্ষালীন অর্থমন্ত্রী এই বিমানবন্দরে একটি রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। বিমানবন্দরে নির্মিত হয় তিনটি স্টোরেজ ট্যাংক, হাইড্রেন্ট লাইন, ডিপো রিফুয়েলার ডিসপেনসার ও ফিল্টার এবং জেট ফুয়েল পরিবহনের জন্য ব্রিজার অর্থাৎ বড় ট্যাঙ্ক লরি। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে পদ্মা ওয়েলের তত্ত্বাবধানে ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে শুরু হয় রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণের কাজ। ২০১৩ সলের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়।

সূত্রমতে, দীর্ঘ কয়েক মাস সিলেট থেকে দুবাই ফ্লাইট পরিচালনা করে। পরে অজ্ঞাত অজুহাতে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে আর কোনো বিদেশি ফ্লাইট সিলেটে এসে নামছে না, উড়ছেও না। তবে এর মাঝে ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় জরুরি ভিত্তিতে সিলেটে অবতরণ করে আটটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এতে প্রমাণিত হয়, সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চাইলে বিদেশি যেকোনো এয়ারলাইনস নামতে ও উঠতে পারবে। এরপর থেকে ঘন কুয়াশার সময়ও অনেক বিদেশি ফ্লাইট সিলেটে অবতরণ করানো হয়।

ওসমানী বিমানবন্দরকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর শতভাগ নিশ্চিত করলে বাংলাদেশের জাতীয় এয়ারলাইন বিমান বাংলাদেশের পাশাপাশি ব্রিটিশ, তুরস্ক, কাতার, আমিরাত, দুবাই, ওমান, সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশের এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চালু করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে বাংলাদেশ বিমানের ভাড়া হ্রাস এবং ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে বিমানের ভাড়ার পার্থক্য দূরসহ কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সেকশনে প্রবাসী যাত্রীদের অহেতুক হয়রানি বন্ধ হবে।

জানা গেছে, পূর্ণাঙ্গতা দিতে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ফুয়েলিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পৃথক সাবস্টেশন স্থাপন, নিরাপত্তার জন্য ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম, যাত্রীদের জন্য এস্কেলেটরসহ অনেক কাজ হয়েছে। কার্গো হ্যান্ডেলিং ক্ষমতা ৪০ হাজার টন থেকে ১ লাখ টনে উন্নীত করা এবং বছরে ৬ লাখ থেকে উন্নীত করে ২০ লাখ যাত্রীসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু সরকারের পক্ষ থেকে অন্যান্য এয়ারলাইনস অবতরণের জন্য এয়ার স্পেস ওপেন স্কাই লাইসেন্সটি এখন পর্যন্ত ইস্যু করা হয়নি। এই লাইসেন্স প্রদান করা হলে অন্যান্য এয়ারলাইনস অবতরণের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না।

প্রায় সাড়ে ৩ শ কোটি টাকার প্রকল্প এখন পরিত্যক্ত নগরী!
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় ১৬৩ একর জমিজুড়ে ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাইটেক পার্কের সুউচ্চ ভবন, প্রশস্ত রাস্তা, আর পরিকল্পিত প্লট  সব মিলিয়ে চোখ ধাঁধানো পরিবেশ। কিন্তু ভেতরে গেলে মেলে শুধু নিস্তব্ধতা। কোনো যন্ত্রের শব্দ নেই, কর্মীদের পদচারণা নেই। এ যেন এক আধুনিক পরিত্যক্ত নগরী।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারা এবং প্রকল্পের অগ্রগতি কম হওয়ায় বিগত অন্তবর্তী সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। ফলে হাইটেক পার্ক ঘিরে কর্মসংস্থানের যে স্বপ্ন দেখছিলেন সিলেটবাসী তা বিবর্ণ হয়ে যায়। 

অবশ্য এবার সেই হাইটেক পার্কটি ফের সচল করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক। সম্প্রতি তিনি পরিদর্শন করে পার্কটিকে সচল করতে সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পুরো বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বর্তমান অবস্থা এবং এইগুলাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাই এবার প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের দিকে চেয়ে সিলেটবাসী।

এছাড়া সিলেট-তামাবিল ৬ লেন মহাসড়ক, সিলেট-গোলাপগঞ্জ ৬ লেন মহাসড়ক ও গোলাপগঞ্জ থেকে বিয়ানীবাজারের সুতারকান্দি স্থলবন্দর পর্যন্ত ৪ লেন দ্রুত নির্মাণ, সিলেট অঞ্চলের সব পাথর কোয়ারি থেকে হাতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি প্রদান, সিলেটেরই সম্পদ গ্যাস এ অঞ্চলের ঘরে ঘরে প্রদান, পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে প্রতি মাসের অর্ধেক থেকে শুরু হওয়া সংকট কাটানো, চাহিদা অনুযায়ী সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্ধিত এলাকায় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকরণের দাবি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে।

সিলেটবাসীর আশাব্যঞ্জক মন্তব্য- এবারের সরকার, করবে না নিরাশ।