মতামত

মাদকের বিষাক্ত ছোবলে সিলেট : বিপর্যয় ঠেকাতে প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ

Icon
মতামত ডেস্ক :

০৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মাদকের বিষাক্ত ছোবলে সিলেট : বিপর্যয় ঠেকাতে প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ

সিলেট অঞ্চলে প্রায়শই আইনশৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বড় বড় মাদকের চালান ধরা পড়ার খবর সংবাদ শিরোনাম হয়। কিন্তু এই আপাত সাফল্য ও নিয়মিত অভিযানের পরও বাস্তবতা হচ্ছেÑসিলেটের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে মাদকের বিস্তার কমেনি, বরং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভারতীয় সীমান্তবর্তী দীর্ঘ ভূখণ্ড, ভৌগোলিক অবস্থান এবং চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে সিলেট আজ মাদকের অন্যতম প্রধান রুট ও ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। শুধু অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) বা মদের চালান ধরা পড়ার খবরে স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ তলদেশের প্রকৃত চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক।


মাদকের এই অপ্রতিরোধ্য বিস্তার কেবল তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে না, বরং চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো নানা অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠে এসেছেÑনিয়মিত অভিযান সত্ত্বে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না কেন?


অনুসন্ধানে দেখা যায়, মূলত তিনটি কারণে মাদকের মূল জট ছাড়ানো যাচ্ছে না:
১. চালান ধরা পড়লেও নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী গডফাদার ও অর্থযোগানদাতারা অধরাই থেকে যায়।
২. সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও পুলিশের কঠোর নজরদারির অভাব এবং কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ।
৩. দুর্বল তদন্ত ও প্রসিকিউশনের অভাবে আসামিরা সহজে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।


এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল প্রচলিত অভিযান বা কাগুজে আশ্বাসে কাজ হবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণে সিলেটের প্রশাসন ও সমাজকে এখনই একটি সমন্বিত ও কঠোর কৌশল অবলম্বন করতে হবে:


সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তি: সিলেটের সীমান্তবর্তী প্রবেশপথগুলোতে বিজিবির টহল বাড়াতে হবে এবং রাতের আঁধারে চোরাচালান বন্ধে থার্মাল ক্যামেরা ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।


জিরো টলারেন্স ও গডফাদারদের চিহ্নিতকরণ: শুধু খুচরা বিক্রেতা বা ক্যারিয়ারদের গ্রেপ্তার না করে মাদকের সিন্ডিকেট ও এর পেছনের গডফাদারদের তালিকা তৈরি করে তাদের মূল উপড়ে ফেলতে হবে।


আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা: যেসব কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।


দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ: মাদকের মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বের হতে না পারে।


সামাজিক প্রতিরোধ ও যুবসমাজকে সম্পৃক্তকরণ: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত মাদকবুল বিরোধী সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। পাশাপাশি যুবসমাজকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পুনর্বাসন কেন্দ্র ও কাউন্সিলিং: যারা ইতিপূর্বে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের চিকিৎসার জন্য সিলেটে মানসম্মত সরকারি রিহ্যাবিলিটেশন (পুনর্বাসন) কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যাতে তারা সুস্থ জীবনে ফিরতে পারে।


সিলেটকে মাদকমুক্ত করা এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানোর লড়াই। কালক্ষেপণ না করে প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ জনগণকে একসাথে রাজপথে ও সামাজিক প্রতিরোধে নামতে হবে। আজ যদি এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা না যায়, তবে আগামী দিনের চরম মূল্য আমাদের পুরো সমাজকেই দিতে হবে।