মতামত
২০ই আগস্ট, ২০২৬
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বিএনপি ২১২ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনের ৫ দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এ হিসাবে ১৭ আগস্ট পূর্ণ হয়েছে সরকারের ৬ মাস। ৪৮ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৫ মন্ত্রী ও ২৩ প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের বিভিন্ন খাতে বহুবিধ উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছে সরকার। সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে : প্রথম ৬ মাসের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ বা অধিকাংশ পূর্ণ হয়েছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষকদের কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফ করা হয়, যার সুফল পান প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসীর কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মাননার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার নিয়ে চুক্তি ও আলোচনা হয়েছে।
সরকারের এ দাবির বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো বলেছে, গ্যাস ও জালানি সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি নিয়ে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছে। তারা অভিযোগ করেছে, সরকার তাদের প্রথম ৬ মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রবণতা রয়েছে।
সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান থেকে যা কিছু দাবি করা হোক না কেন, তারপরও একটি বড় কথা থেকে যায়। প্রশ্ন হলো, কী অবস্থায় বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে? ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেখা গেল রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া একেবারে ধসে পড়েছে এবং অকার্যকর হয়ে গেছে। ডারন এসেমগলু ও রবিনসনস তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Why Nations Fail’-এ দেখিয়েছেন, যে জাতির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে, সে জাতি ব্যর্থ হয়ে যায় বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। লেনিনের ভাষায় রাষ্ট্র বলতে আমরা বুঝি সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আমলাতন্ত্র, কারাগার, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচার বিভাগ। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবলোকন করি তাহলে প্রথমত দেখব, সামরিক বাহিনীতে কী ধরনের ক্ষতিকর সংক্রমণ ঘটেছিল। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর বেশ কিছুসংখ্যক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার ভারতে পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানও রয়েছেন। এই যদি হয় একটি দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার অবস্থা, তাহলে সেই দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অনেকটা আকাশে ভাসমান খেলনা বেলুনের মতো হয়ে যায়, যা সূক্ষ্ম একটি ফুটোতেই চুপসে পড়ে। এছাড়া উচ্চপদস্থ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। এদের কেউ কেউ এখন বন্দিদশায় রয়েছেন এবং বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা অভ্যুত্থান-উত্তর অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ক্যু করতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তবে এটাই সামরিক বাহিনীর প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। সামরিক বাহিনীর দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রমনা সদস্যরা শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী ছাত্র-জনতাকে খুন করতে চায়নি। তারা ছাত্র-জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল পুলিশবাহিনী ও তাদের অনেক অফিসার। বস্তুত পুলিশবাহিনী ছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ঠেঙাড়ে বাহিনী। হাসিনার মসনদকে চিরস্থায়ী করার প্রয়াসে এদের ছলাকলা ও কৌশলের অন্ত ছিল না। এরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার হয়রানিমূলক, ফরমায়েশি মামলা দায়ের করে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সরকারবিরোধীদের অনেককে গুম করা হয়েছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকারে পরিণত করা হয়েছে। অনেককে তুলে নিয়ে গিয়ে আয়নাঘরে বছরের পর বছর নিরুদ্দেশ হিসাবে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর পুলিশবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ব্যারাক, থানা, ফাঁড়ি ও অস্ত্র পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেছে। এদের অনেকে কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ফিরে আসেনি। দেশ কার্যত পুলিশশূন্য হয়ে পড়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কোনো ধরনের পাহারা ও নজরদারি বজায় ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক নিয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিনসহ কর্মকর্তাদের অনেকে পালিয়ে গেছেন অথবা আত্মগোপনে চলে গেছেন। শিক্ষার্থীরা বেশকিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের সক্রিয় ক্রীড়নক হওয়ার অভিযোগ এনেছে এবং এদের নেওয়া ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছে। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনে আমলাতন্ত্র পরিণত হয়েছিল হাতের পুতুলে। তথাকথিত মুজিববর্ষে এরা শেখ মুজিবের শতশত মূর্তি গড়েছে, মুজিব বন্দনায় শতশত অনুষ্ঠান করেছে। মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানাদি করার নামে এরা রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছে। দলীয়করণ এমন জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, বায়তুল মোকাররমের খতিব পর্যন্ত পালিয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের এমনভাবে ভেঙে পড়া থেকে এমন মন্তব্য করা যায়, পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রটি ছিল বিলুপ্ত হওয়ার পথে। দেশ ও জাতি অপেক্ষা করছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিবর্তে নতুন এক বিপ্লবী রাষ্ট্রযন্ত্রের পুনঃস্থাপন। কিন্তু ছিল না কোনো বিপ্লবী নেতৃত্ব, বিপ্লবী দল ও বিপ্লবী মতাদর্শ। তাই যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। পুরোনো ব্যবস্থা পুনরুৎপাদিত হয়েছে।
নির্বাচিত নতুন সরকার এমনই এক প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তারা বিপ্লবের কথা বলেনি। তারা বলেছে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন এবং পুনঃরূপায়ণ। এমন ভাঙা হাটে কতদূর কী করা যায় সেটাই প্রশ্ন! তবে এমন সীমাবদ্ধতার মধ্যে আন্তরিক প্রয়াসই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। পরিসংখ্যানের হিসাবে সরকার গত ৬ মাসে কতদূর কী করতে পারল, সেই প্রশ্ন উত্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কোনো অবকাশ নেই। সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তরিক কি না সেটাই বিচার্য বিষয়। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ ও আসল মওকুফ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এটি একটি জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্ত। অর্থনীতিশাস্ত্রের বিচারে এক্ষেত্রে Due Diligence-এর অভাব রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হলো। এই কৃষিঋণ মওকুফের ফলে ১৩ লাখ কৃষক পরিবার ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেয়েছে। এরা কৃষি উৎপাদনে অবদান রেখেছে এবং কৃষিতে শ্রম দিয়ে ফসলের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। কাজেই একথা বলা যাবে না যে, কোনোরকম অবদান না রেখেই এরা ঋণের দায় থেকে রেহাই পেয়েছে। এদেশে শত-সহস্র কোটি টাকা খেলাপি হয়েও অনেক ঋণগ্রহীতা দিব্যি বহাল তবিয়তে থাকে। এদের তুলনায় যাদের কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে, তারা শতগুণ উন্নত মানুষ। ওদের মতো বিবেকহীন নয়।
সরকারপ্রধান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে বেশকিছু প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সময়মতো অফিসে উপস্থিতি, সড়কপথে চলাচলে গাড়িবহরে মাত্র ৪টি গাড়ি রাখা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকিতে পড়া সত্ত্বেও এবং রাষ্ট্রীয় মিটিং ও সভায় আপ্যায়নের জন্য ব্যয় সংকোচনের নীতি জাতীয় কালচারে শুভ সূচনা ঘটিয়েছে। জাতি দেখতে চায়, এমন ধরনের কালচার রাষ্ট্রের সর্বপর্যায়ে অনুশীলন করা হবে। আমাদের দেশে মিটিং-সেমিনারের নামে যে ভোজের ব্যবস্থা করা হয়, তাতে অর্থের অনেক অপচয় ঘটে।
সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আশা করা যায়, দেশে বিদ্যমান বহুধাবিস্তৃত ও অবিন্যস্ত সামাজিক সুরক্ষা জালের পরিবর্তে এ ধরনের কার্ডের প্রবর্তন দুর্নীতিকে হ্রাস করবে এবং জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারপ্রধানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর বহুলভাবে সফল ও সার্থক হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের নিরাপদ প্রবেশের পথ প্রশস্ত হয়েছে। গণচীনের সঙ্গে বেশকিছু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। ঢাকা-কুনমিং করিডর যদি অদূরভবিষ্যতে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশ ভারত-বদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এটা হবে সবচেয়ে বড় অর্জন। গণচীনের ঐকান্তিক প্রয়াস থাকলে এ করিডর গঠনে বিদ্যমান সমস্যাগুলো অচিরেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। গণচীন ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে উভয় দেশের সম্পর্ক Shared destiny with common future-এ উন্নীত হয়েছে। গণচীন এখন বাংলাদেশকে আরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবে দেখছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু এ সফরের জন্য দিল্লি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে না। দিল্লিতে বসে পলাতক শেখ হাসিনা বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টে নানা রকম উসকানিমূলক কথা বলে চলেছে। ভারত সরকার তাকে না নিবৃত্ত করছে, না তাকে উভয় দেশের চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করছে। এমনই এক অবস্থায় ভারতের পদলেহী এক রাজনৈতিক নেতা সামাজিক মাধ্যমে ফটোকার্ড করে বলে চলেছেন, ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ না করলে ভারত এটাকে সহজভাবে নেবে না। আগামী দিনে ভারত কী করবে, তা বলতে পারব না। তবে বাংলাদেশের প্রতি বৈরী আচরণে ভারত কতটা নিবৃত্ত থাকে, তা দেখার বিষয়। ভারত সফর প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারছেন, এমনটাই বিশ্বাস করতে চাই।
লেখক : জাতীয় অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ।
দৈনিক যুগান্তরের উপ-সম্পাদকীয় থেকে সংগৃহীত।
আপলোড : আব্দুল খালিক