মতামত

অনুত্তীর্ণের হার ৪২ শতাংশ : সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় এখনই

Icon
আব্দুল খালিক

১০ই আগস্ট, ২০২৬

অনুত্তীর্ণের হার ৪২ শতাংশ : সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় এখনই

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। সারাদেশের ফলাফলে এবার পাসের হার কমেছে। গত বছর যেখানে গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, এবার তা নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। তবে জাতীয় ফলাফলের চেয়ে সিলেটবাসীর জন্য বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলেট বিভাগের ফলাফল। এবার সিলেটে পাসের হার ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪২ জনই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ চিত্র নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।

একটি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর মেধা বা ভবিষ্যৎ বিচার করা যায় না। কিন্তু যখন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন বিষয়টিকে কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন উঠতে বাধ্য- আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি? শিক্ষার্থীরা কি যথাযথভাবে পাঠ পেয়েছে? শিক্ষকরা কি তাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছেন? প্রতিষ্ঠানগুলো কি নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন জরুরি।

সিলেট মেধাবী শিক্ষার্থীদের অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থী প্রতিবছর জাতীয় পর্যায়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে। ফলে সিলেটের পাসের হার যখন ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমে আসে, তখন এটিকে নিছক একটি পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত।

বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু ক্লাস নেওয়া এবং পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কৃতিত্ব দাবি করা নয়। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করেও যদি কাক্সিক্ষত জ্ঞান অর্জন করতে না পারে, কোনো বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল থাকে কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়েÑতাহলে সেটি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রতিষ্ঠানেরই দায়িত্ব। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং অভিভাবকের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও নিজেদের পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলে শুধু তার অমনোযোগ বা পড়াশোনায় অনীহাকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন শিক্ষক কতটা সহজবোধ্যভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছেন, শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার সুযোগ কতটা রয়েছে, দুর্বল শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে কতটা সময় দেওয়া হচ্ছে- এসব বিষয়ও শিক্ষার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দায় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষকের নয়। অভিভাবকদেরও সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করার চাপ নয়, সন্তান কী শিখছে, কোথায় সমস্যায় পড়ছে এবং কীভাবে সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে- সেদিকেও নজর দিতে হবে। আর শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও ফলাফল নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা। কোনো প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল করলে তার কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এবারের ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑলিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার প্রায় তিন মাস পর ফল প্রকাশ হয়েছে। ফল প্রকাশে বিলম্ব শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ বাড়ায় এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলে। ভবিষ্যতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

আমরা মনে করি, এবারের ফলাফলকে কাউকে দোষারোপ করার উপলক্ষ না বানিয়ে ‘শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত ও সংশোধনের সুযোগ’ হিসেবে নেওয়া উচিত। সিলেটে কোন বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা বেশি ব্যর্থ হয়েছে, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান বা অঞ্চলে ফলাফল তুলনামূলক খারাপ, এর পেছনে শিক্ষকস্বল্পতা, পাঠদানের দুর্বলতা, অবকাঠামোগত সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না- এসব নিয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ভালো ফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একজন শিক্ষার্থী সত্যিকার অর্থে কতটা শিখছে, চিন্তা করতে পারছে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছে।

সিলেটের প্রায় ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি- এই সংখ্যা আমাদের জন্য একটি সতর্কসংকেত। এই সংকেত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও যতœবান হতে হবে, শিক্ষকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে, শিক্ষা প্রশাসনকে আরও জবাবদিহিমূলক হতে হবে এবং অভিভাবকদেরও আরও সচেতন হতে হবে।

আজকের ব্যর্থ শিক্ষার্থীই আগামী দিনের নাগরিক। তাই তাকে ব্যর্থতার দায় দিয়ে পাশে সরিয়ে না রেখে কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা খুঁজে বের করে আবারও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। এবারের ফলাফল আমাদের হতাশ করেছে- কিন্তু এই হতাশা থেকেই যদি আমরা সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও মানসম্মত, দায়িত্বশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করার উদ্যোগ নিই, তবেই এই ফলাফল থেকে সত্যিকার শিক্ষা নেওয়া হবে।

সিলেটের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকবে- এটি মেনে নেওয়া যায় না। এখন সময় ফলাফল নিয়ে শুধু আফসোস করার নয়; সময় এসেছে কারণ অনুসন্ধান, জবাবদিহি ও কার্যকর সংস্কারের।

লেখক : সাংবাদিক।