মতামত
০৬ই আগস্ট, ২০২৬
সিলেট শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জ। ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও শিক্ষাগত ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই জনপদ বহু গুণীজনের জন্মভূমি। স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল হিসেবে জকিগঞ্জের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত দিক থেকে উপজেলাটি এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
বিশেষ করে জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের প্রায় ৯০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সিলেট শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও দুর্ভোগও বাড়ে। তাই জকিগঞ্জের উন্নয়নের কথা বলতে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের এই দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসন থেকে বিভিন্ন সময়ে আলেম-উলামারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন সংসদ সদস্য মাওলানা মুফতি আবুল হাসান।
তবুও উপজেলার অন্যতম প্রধান সমস্যা রয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশেষ করে শেওলা সড়ক সহ উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আমার নিজ ইউনিয়ন ৮ নং কসকনকপুর ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ১৮.৯ বর্গকিলোমিটার। এখানে কয়েক কিলোমিটার পাকা সড়ক থাকলেও দীর্ঘদিন থেকে সংস্কারের অভাবে সেগুলোর অনেক অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। চেকপোস্ট-হাজীগঞ্জ সড়ক, সোনাসার-মুনশীবাজার সড়ক, হাতিডহর-নগরকান্দি-টাকারবন্দ-মির্জারচক সড়ক সহ গ্রামের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোর বেহাল দশার কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বর্ষাকালে এই দুর্ভোগ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই চিত্র শুধু কসকনকপুরে নয়, বরং পুরো উপজেলার অবস্থা একই রকম।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুম এলেই উপজেলার সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দেয়। এতে বহু পরিবার বসতভিটা, কৃষিজমি ও মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই জকিগঞ্জের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সড়ক সংস্কার এবং নদীভাঙন প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও জকিগঞ্জবাসী দীর্ঘদিন ধরে চরম সংকটের মুখোমুখি। প্রায় তিন লাখ মানুষের এই উপজেলায় সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা একমাত্র জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ বিপুল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে সেখানে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। অল্পসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে পুরো উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ফলে অনেক রোগী কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের প্রায় ৯০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সিলেট শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও দুর্ভোগও বাড়ে। তাই জকিগঞ্জের উন্নয়নের কথা বলতে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের এই দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জকিগঞ্জ থেকে সিলেট পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। এমন উদ্যোগকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।
তবে বাস্তবতা হলো, রেলপথ ভবিষ্যতের স্বপ্ন হলেও বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য সড়ক। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, রোগীসহ হাজারো মানুষ উপজেলা এসব ভাঙাচোরা রাস্তা ব্যবহার করে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাই রেলপথ প্রকল্পের পাশাপাশি, বরং তারও আগে উপজেলার জরাজীর্ণ গ্রামীণ সড়কগুলোর সংস্কার ও পাকাকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
জকিগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা একটাই- আগে চলাচলের মৌলিক সমস্যার সমাধান হোক। তারপর রেলপথসহ অন্যান্য বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হোক। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হবে। আমাদের দাবি একটাই: আগে রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন, পরে রেলপথ।
লেখক : শিক্ষক, সংগঠক ও সংবাদকর্মী।
আপলোড : আব্দুল খালিক