মতামত

জামায়াতকে ছাপিয়ে যেতে মরিয়া এনসিপি

Icon
আব্দুল খালিক

০২ই আগস্ট, ২০২৬

জামায়াতকে ছাপিয়ে যেতে মরিয়া এনসিপি

সরকারের মূল প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। দলটির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ, জামায়াত জোটের সাথে দূরত্ব এবং নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর মাধ্যমেই মূলত এই রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে তারা। আর সেই চেষ্টার মূল প্লাটফর্ম হলো জুলাই কর্মসূচি। এই জুলাই কর্মসূচি কিংবা জুলাইয়েই নিজেদের সর্বোচ্চটা জানান দিতে এনসিপি যে মাস্টার স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছিল, রাজপথে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।


স্ক্রিপ্টের মুখ্য অভিনেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী খুব দক্ষতার সাথে নিখুঁত অভিনয় করছেন। ক্যামেরার সামনে হাবাগোবা আর মাইক্রোফোনের সামনে কড়া ভাষায় বিএনপি বা সরকারের সমালোচনা- এই দ্বৈত অভিনয়টা সিচুয়েশন বুঝে সামাল দিচ্ছেন।


সম্প্রতি হবিগঞ্জের সমাবেশে এনসিপির উপর বিএনপির হামলা যেনো তাদের কপাল খুলে দিয়েছে। লক্ষ্যপথে কয়েকধাপ এগিয়ে যাওয়া এনসিপি সিলেটের গোলাপগঞ্জে এসেও দুদফা হামলার শিকার হয়। এরপর কানাইঘাটে বিশাল সমাবেশ করে রাতে ওসমানীনগরের সমাবেশ সম্পন্ন করে। ওই রাতে ফুলবাড়িয়ায় এনসিপির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ কর্মসূচি পালন করতে গেলে সেখানেও তারা হামলার শিকার হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তথা তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো এই হামলাকে অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করছেন। তাদের মতে- সাবলিল ভাষায় রাজনৈতিক সমালোচনা না করে উস্কানিমূলক কথা বললে হামলা হওয়াটা স্বাভাবিক।


তবে এই অস্বাভাবিক আচরণ করাটাই এনসিপির রাজনৈতিক কৌশল। হ্যাঁ, যদি মনে করেন তারা গায়ে পড়ে বিরোধ সৃষ্টি করছে, তবে তা-ই ঠিক। আপাতত এনসিপির কাছে এই কৌশলটিই একমাত্র অস্ত্র এবং তাতে তারা বেশ সুফলও পাচ্ছে। প্রত্যেকটা সমাবেশে তারা কী বক্তব্য রাখবেন, কী নিয়ে আলোচনা করবেন, কাকে উদ্দেশ্য করে উস্কানি দিবেন এবং এর পরবর্তী পরিণাম কী হবে সবই তাদের স্ক্রিপ্টে সাজানো।


আপাত দৃষ্টিতে এনসিপিকে ঘোর সরকার বিরোধী মনে হলেও আদতে তা ড্রামা। এই মুহূর্তেই তারা মন থেকে সরকারের বিরোধীতা করতে চাইছে না। কিন্তু জামায়াতকে ছাপিয়ে যেতে কৌশলগত কারণে এটি করতে হচ্ছে। তবে সেটি লোক দেখানো। যা স্ক্রিপ্টের অংশ মাত্র। ফলে সরকারও বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। দলীয় লোকদের দিয়ে মামলা-হামলা করাচ্ছে না। বরং, সবাইকে সংযত হয়ে ধৈর্য্য ধারনের তাগিদ দিচ্ছে। কারণ, সরকারকে গালিগালাজ করে এনসিপি যতটা লাভমান হচ্ছে, সাথে সরকারও ততটা লাভমান হচ্ছে। মাঠে পরিশ্রম করছে এনসিপি, অথচ লাভের ভাগ নিচ্ছে সরকারও। উভয় পক্ষেরই এ ব্যাপারে যথেষ্ট বোঝ রয়েছে।


তাহলে এনসিপি কার সাথে খেলছে?
উত্তর হলো এনসিপি মূল খেলাটা জামায়াতের সাথেই খেলছে। যেমন- জুলাই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মাসের শুরু থেকেই আলোচনায় রয়েছে দলটি। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পদযাত্রায় গিয়ে হামলার শিকার হয়ে যেমন মিডিয়া দখল করে আছে, তেমনি জায়গা করে নিয়েছে দেশের আপামর জনতার মনে। খেয়াল করলে দেখবেন- দেশের অধিকাংশ তরুণ-যুবক এনসিপির ভক্ত। বিএনপি, জামায়াত কিংবা শিবির যে দল-ই করুক না কেনো নাহিদ, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিসদের নিয়ে তাদের মনে একটি সফটকর্নার রয়েছে। সম্প্রতি এমন দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনারাও দেখেছেন, আমিও দেখেছি। আর গোটা বিশ^কেই এটি দেখাতে সবরকম মেটিকুলাস ডিজাইন ব্যবহার করছে এনসিপি। মূলত এনসিপি চাইছে- পাবলিক সেন্টিমেন্ট নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া, বিশ^ দরবারে নিজেদের বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে জাহির ও বৈশি^ক সমর্থন আদায় করা, রাজাকার-যুদ্ধাপরাধী ট্যাগমুক্ত একটি শিক্ষিত ও তারুণ্য নির্ভর রাজনৈতিক দল হিসেবে আগামীর রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান ও সরকারের মূল প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের দাঁড় করানো।


এনসিপির জন্ম ও রাজনৈতিক অবস্থান :
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)’র মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদেরকে একটি “বিকল্প” এবং “মধ্যপন্থী” রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তবে, প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছর চার মাস পরেই দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরআগে দল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর সাথে যুক্ত এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দলটির বেশ কয়েকজন নেতা একসময় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে, জামায়াতের প্রভাবমুক্ত হয়ে এনসিপি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে একেবারে শুরু থেকেই আলোচনা চলছিল। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটের পর এই প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে। তাছাড়া, জোট নিয়ে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বে এক অস্বস্তিকর উভয়সংকটের সম্মুখীন হয়। ফলে জোটে যোগদানের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বামপন্থী ও মধ্যপন্থী পটভূমির অন্তত ১৭ জন নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন।


স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বতন্ত্রনীতি ও প্রার্থীতা ঘোষণা :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) বেশ কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনার জন্ম দিয়েছে।

এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে, জামায়াতও স্বতন্ত্রভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে শুরু করেছে।
তাহলে এনসিপি কী করবে? দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা দুই ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আপাতত, তাঁরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, তা নির্বাচনের আগেই নেওয়া হবে।
২৯ মার্চ, এনসিপি ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনসহ পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। দলীয় নেতারা জানান, বাকি সিটি কর্পোরেশনগুলোর প্রার্থীদের নামও শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে। এরপর, ১০ মে দলটি ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। আগামী ২০ মে আরও ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভার জন্য প্রার্থীদের আরেকটি ব্যাচ ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে দলীয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। দলটি সেখানে তাদের প্রার্থী হিসেবে ডাকসু সহ-সভাপতি মো. আবু সাদিককে চূড়ান্ত করেছে। জুলাই আন্দোলনের এই দুই ছাত্রনেতার নির্বাচনী ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এনসিপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই শহরে প্রার্থীপদ নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোট নাও হতে পারে এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জামায়াত জোট ছাড়ছে এনসিপি!
কয়েক দিন আগে জোট ছেড়েছে খেলাফত মজলিস। এবার জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে।
দলীয় সূত্রমতে, এনসিপির ভেতরে জোটে থাকার রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিকল্প জোট গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
এনসিপির নেতারা বলছেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য একটি বৃহৎ জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। তাদের মতে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলে সে সুযোগ সীমিত। নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে সেখানে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকার সম্ভাবনা বেশি।
গণমাধ্যমে দলীয় সূত্র জানায়, কওমি ঘরানার কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে সংস্কার, বিচার, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন কোনো জোট গঠিত হলে সেখানে এনসিপির ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের এক সদস্য সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জুলাই মাসের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দলীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

কওমি দলগুলোর উদ্যোগ :
এদিকে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় সাতটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঐক্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া সূত্রগুলোর দাবি, সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে লিখিতভাবে তাদের মতামত ও প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের কাঠামো, নেতৃত্ব ও কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, এনসিপির নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তারা নতুন উদ্যোগে যুক্ত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

জামায়াতের প্রতিক্রিয়া :
জামায়াতে ইসলামীর একটি অংশ মনে করছে, তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে ভাঙন ধরানোর পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের ভেতরে কোনো সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। এনসিপির তৎপরতা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিষয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয় পর্যায়ে সমঝোতা হয়েছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই বাস্তবতা ভিন্ন। কোথাও সমঝোতা হলে তা স্থানীয় পর্যায়েই হবে।

লেখক : সাংবাদিক।