জীবন

পুরুষত্ব কি কেবলই টেস্টোস্টেরন হরমোন? দেখুন বিজ্ঞান কী বলে-

Icon
জীবন ডেস্ক

২৩ই জুলাই, ২০২৬

পুরুষত্ব কি কেবলই টেস্টোস্টেরন হরমোন? দেখুন বিজ্ঞান কী বলে-

পুরুষদের শক্তি, আগ্রাসন এবং শক্তিমত্তার পেছনে মূল কারিগর হিসেবে প্রায়শই টেস্টোস্টেরন হরমোনকে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণ ধারণা হলো, শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা যত বেশি, একজন পুরুষ তত বেশি শক্তিশালী ও লড়াইয়ে সক্ষম। 

তবে পুরুষত্ব নিয়ে গবেষণারত মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল।

টেস্টোস্টেরনের আসল কাজ কী? 

টেস্টোস্টেরনকে সাধারণত ‘পুরুষ হরমোন’ হিসেবে মনে করা হলেও সকল লিঙ্গের মানুষের শরীরেই নির্দিষ্ট মাত্রায় এটি তৈরি হয়। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোরদের শরীরে টেস্টোস্টেরন বেড়ে মাংসপেশি গঠন, চুল গজানো ও শুক্রাণু উৎপাদনে সাহায্য করে। 

৩০ বছর বয়সের পর এটি প্রাকৃতিক নিয়মে কমতে থাকে। যখন রক্তে এর মাত্রা অস্বাভাবিক কমে গিয়ে চরম ক্লান্তি, কামবাসনা হ্রাস বা দ্রুত মাংসপেশি ক্ষয়ের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তখন কেবল চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ‘টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি’র প্রয়োজন হয়।

স্বাস্থ্যসেবায় একজন সুস্থ পুরুষের রক্তে টেস্টোস্টেরনের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় প্রতি ডেসিলিটারে ৩০০ থেকে ১,০০০ ন্যানোগ্রাম। একজন পুরুষের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ৭০০ হলেও তিনি ৩০০ মাত্রা থাকা পুরুষের চেয়ে বেশি ‘পুরুষালী’ বা শারীরিক দিক থেকে শক্তিশালী—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। 

শরীরে মাংসপেশি গঠনে হরমোনের ভূমিকা থাকলেও শারীরিক শক্তির আসল চাবিকাঠি হলো উপযুক্ত অনুশীলন, ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস। 

অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন সেবনের ঝুঁকি

সুস্থ মানুষের শরীরে বাইরে থেকে অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন প্রয়োগ করার বিষয়টি বেশ বিপজ্জনক। বাইরে থেকে হরমোন গ্রহণ করলে শরীরের নিজস্ব টেস্টোস্টেরন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে অণ্ডকোষ সংকুচিত হতে পারে এবং শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হয়। 

এছাড়া অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন তৈলাক্ত গ্রন্থি ও চুলের ফলিকেলগুলোকে উত্তেজিত করে এবং শরীরে ইস্ট্রোজেনে রূপান্তরিত হয়। ফলে ব্রণ, চুল পড়া এবং পুরুষদের স্তনের টিস্যু বৃদ্ধির (গাইনেকোমাস্টিয়া) মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা ও মিথ 

দীর্ঘ চার দশকের গবেষণা বলছে, রক্তে উচ্চমাত্রার টেস্টোস্টেরন মানেই একজন মানুষ হিংস্র বা প্রভাবশালী হবেন—এমন কথার জোরালো প্রমাণ নেই। ২০০১ সালে ১০,০০০ মানুষের ওপর পরিচালিত ৪৫টি গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেস্টোস্টেরন ও আগ্রাসী আচরণের মধ্যে সম্পর্ক খুবই সামান্য।

প্রকৃতপক্ষে, হরমোন মানুষকে নির্দেশ করে না, বরং মানুষের আচরণ ও পরিবেশ হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাঠের বোর্ড গেম স্পর্শ করার চেয়ে ১৫ মিনিট হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ধরে রাখা পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং তারা আক্রমণাত্মক আচরণ করে।

আবার নতুন বাবা হওয়া পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা সন্তানকে যত বেশি লালন-পালন ও স্পর্শ করেন, তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা তত কমে আসে।

গবেষকদের মতে, পুরুষদের আগ্রাসী আচরণের মূল অনুঘটক হলো সামাজিক চাপ। পুরুষত্ব হুমকির মুখে পড়লে কিংবা সমাজে ‘আদর্শ পুরুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাহ্যিক চাপ থেকে সিংহভাগ পুরুষ আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখায়।

সামরিক জীবন ও টেস্টোস্টেরন হ্রাস

একটি অমূলক ধারণার বিপরীতে সামরিক জীবনের কঠোর পরিশ্রম পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে তা কমিয়ে দেয়।

২০২০ সালে মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রশিক্ষণকালীন চরম ঘুমহীনতা ও তীব্র স্ট্রেসের কারণে পুরুষদের হরমোন নিঃসরণ ব্যাপক হারে কমে যায়। একে চিকিৎসা পরিভাষায় ‘অপারেটর সিন্ড্রোম’ বলা হয়। 

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, পুষ্টির অভাব এবং ঘুমহীনতার ফলে অনেক ক্ষেত্রে ৩৫ বছর বয়সি সৈনিকের শরীরের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে ৮০ বছরের প্রবীণ মানুষের সমপর্যায়ে নেমে আসে। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে অতিরিক্ত হরমোন ইনজেকশন দেওয়া ক্ষতিকর; বরং উপযুক্ত বিশ্রাম ও স্ট্রেস কমানোই হলো একমাত্র সঠিক উপায়। 

সবশেষে, যুদ্ধ কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে কোনো পুরুষের প্রকৃত সহনশীলতা ও দক্ষতা একটি হরমোনের ওপর নির্ভর করে না। টেস্টোস্টেরন মানবদেহের একটি দরকারি জৈবিক উপাদান হতে পারে, তবে এটি একজন মানুষের সামর্থ্য বা আদর্শ পুরুষত্বের মাপকাঠি নয়। 

 

আপলোড : আব্দুল খালিক