মতামত

প্রতিবাদের নামে শিক্ষার্থীদের মুখে অশ্রাব্য ভাষা কেন?

Icon
রেজাউল হক ডালিম :

১৬ই জুলাই, ২০২৬

প্রতিবাদের নামে শিক্ষার্থীদের মুখে অশ্রাব্য ভাষা কেন?

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ছাত্র আন্দোলন ও বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচির আড়ালে এক উদ্বেগজনক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। অধিকার আদায়ের আন্দোলন বা যেকোনো যৌক্তিক প্রতিবাদের একটি নিজস্ব গাম্ভীর্য ও মর্যাদা থাকে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু শিক্ষার্থীর মুখে এমন সব অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা শোনা যাচ্ছে, যা কোনো সুস্থ ও সভ্য সমাজের চেনা রূপের সাথে মেলে না। এমনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, বিশেষ করে খোদ শিক্ষামন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে কদর্য স্লোগান বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চরম আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।

প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের আছে। কিন্তু সেই ক্ষোভ যখন গালমন্দ ও নোংরামিতে রূপ নেয়, তখন আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যই পথ হারায়। কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে কখনো কোনো মহৎ বা যৌক্তিক দাবি আদায় করা সম্ভব নয়; বরং এতে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের নৈতিক সমর্থন হাতছাড়া হয়। শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি। তাদের কাছ থেকে জাতি যৌক্তিক আচরণ, মেধা ও শালীনতার বহিঃপ্রকাশ আশা করে, কোনো উগ্রতা বা নোংরা সংস্কৃতির চর্চা নয়।

অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু শালীনতা ও গুরুজনদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান বর্জন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মেধার সাথে যদি শিষ্টাচারের সমন্বয় না ঘটে, তবে সেই শিক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত অপসংস্কৃতি রুখতে এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকে। একজন মানুষের নৈতিক চরিত্র ও আচরণের প্রথম পাঠশালা হলো তার পরিবার। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে অনেক অভিভাবকই সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল কিংবা ভালো জিপিএ পাওয়ার পেছনে যতটা মরিয়া, সন্তানের নৈতিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ে ততটা সচেতন নন। সন্তান বাইরে গিয়ে কী করছে, কাদের সাথে মিশছে, কোনো উগ্র ও নীতিহীন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে কি না—তা নিয়মিত তদারকি করা প্রতিটি বাবা-মার দায়িত্ব।

সন্তানের মুখে অশালীন ভাষা বা প্রবীণদের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখলে পরিবার থেকেই কঠোরভাবে শাসন ও সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্ধ স্নেহ অনেক সময় সন্তানের ভুল পথকে প্রশ্রয় দেয়, যা পরবর্তীতে তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঘরেই গড়ে তুলতে হবে পরমতসহিষ্ণুতা ও ভদ্রতার পরিবেশ।
সময় এসেছে আমাদের আত্মোপলব্ধির। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—এই তিন স্তরে যদি সুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা পুনরায় জোরদার করা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক চরম সামাজিক ও মানসিক সংকটের দিকে ধাবিত হবে। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, যুক্তির জোরই সবচেয়ে বড় জোর, গালমন্দ বা উগ্রতা নয়। আসুন, পারিবারিক অনুশাসন ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে আমরা তরুণ প্রজন্মকে এক অপসংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করি এবং তাদের মেধাকে দেশের কল্যাণে নিয়োজিত করার পথ সুগম করি।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সচিত্র সিলেট