মতামত
০৮ই জুলাই, ২০২৬
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেটসহ সারা দেশেই গরমের তীব্রতা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব তো আছেই, কিন্তু আমাদের স্থানীয় পরিবেশগত বিপর্যয় এই তাপপ্রবাহকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। একসময়ের সবুজ-শ্যামল সিলেট শহর এখন যেন এক তপ্ত কংক্রিটের জঙ্গল। এর অন্যতম প্রধান কারণÑউন্নয়নের নামে সড়কের দুই পাশের ছায়াদানকারী চিরচেনা গাছগুলো নির্বিচারে কেটে ফেলা।
সিলেটের প্রায় প্রতিটি সড়কের পাশেই একসময় সারি সারি গাছ ছিল। ক্লান্তিহর সেইসব সবুজ ছায়া পথচারী ও চালকদের তীব্র রোদ থেকে স্বস্তি দিত, ধরে রাখত মাটির আর্দ্রতা এবং পরিবেশের ভারসাম্য। কিন্তু রাস্তা সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নানাবিধ ‘উন্নয়নমূলক’ কাজ করতে গিয়ে সেসব প্রাচীন ও ছায়াদানকারী গাছ গণহারে কেটে ফেলা হয়েছে। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই; নাগরিক সুবিধার জন্য রাস্তার পরিবর্ধন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, পরিবেশকে এভাবে মরুভূমি বানিয়ে যে উন্নয়ন, তা দিনশেষে আমাদের কতটুকু কল্যাণ বয়ে আনছে? গাছ কাটার পর সেখানে পুনরায় গাছ লাগানোর যে আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে, তা বরাবরই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
তীব্র তাপদাহ থেকে বাঁচতে এবং নগরীর তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে এখন আর কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ও দ্রুত গতিতে সিলেটের প্রতিটি সড়কের পাশে আবারও গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এই উদ্যোগ যেন কেবলই আনুষ্ঠানিকতা বা লোকদেখানো বৃক্ষরোপণ সপ্তাহে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিগত দিনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও টেকসই বনায়ন।
উপযুক্ত স্থান নির্বাচন:
রাস্তার ড্রেন বা ভূগর্ভস্থ সেবাদানের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে নাÑএমন দূরত্ব বজায় রেখে গাছ লাগাতে হবে।
দেশি প্রজাতির অগ্রাধিকার:
বিদেশি বা ক্ষতিকর একাশিয়া, ইউক্যালিপটাসের মতো গাছ পরিহার করে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নিম, বকুল, সোনালু বা জারুলের মতো ছায়াদানকারী ও পরিবেশবান্ধব দেশি গাছ রোপণ করতে হবে, যা নগরের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য দুই-ই রক্ষা করবে।
রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব:
শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না, সেগুলো যেন গবাদিপশু বা অবহেলায় নষ্ট না হয়, সেজন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাঁচা বা বেষ্টনী দিয়ে পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন, বন বিভাগ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি ‘সবুজ সিলেট টাস্কফোর্স’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। পরিবেশের ক্ষতি করে যে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়, তা কখনো টেকসই হতে পারে না। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে ঘুম ভাঙিয়ে দ্রুত গতিতে সিলেটকে আবার তার চিরচেনা সবুজ ও শীতল রূপে ফিরিয়ে আনার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন।
আপলোড : আব্দুল খালিক