সিলেট

হয়রানি-ভোগান্তির অপর নাম সিলেট পাসপোর্ট অফিস

Icon
মাহমুদ খান :

০৭ই অক্টোবর, ২০২৬

হয়রানি-ভোগান্তির অপর নাম সিলেট পাসপোর্ট অফিস

দালাল ছাড়া পাসপোর্ট করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে। আবেদন জমা দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অনেক সেবাগ্রহীতাকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভেরিফিকেশন, জাতীয়তা সনদসহ বিভিন্ন কাগজপত্রের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কক্ষে যেতে হচ্ছে। তাছাড়া জন্ম সাল ২০০৪ হলে পাসপোর্ট জমা নেওয়া হচ্ছে না, চাওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ডকুমেন্ট। অন্যদিকে দালাল বা অনলাইন দোকানের মাধ্যমে আবেদন করানো ব্যক্তিদের অপেক্ষাকৃত সহজে কাজ হয়ে যায় এ অফিসে।

সরেজমিন সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে গিয়ে দেখা যায়, ১০৮ নম্বর কক্ষের সামনে নারী ও পুরুষ সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘ লাইন। সেখানে কারও আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে, আবার কারও আবেদন বিভিন্ন কারণে গ্রহণ না করে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। অনেক সেবাগ্রহীতাকে ওই লাইন থেকে বের হয়ে ১০০ নম্বর কক্ষের সামনে যেতে দেখা যায়। সেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই অর্থাৎ জাতীয় পরিচয়পত্রের ভেরিফাই কপির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, শিশুদেরও এ ধাপের জন্য পাঠানো হচ্ছে বলে সেবাগ্রহীতারা জানান। এ প্রক্রিয়া শেষে আবার ১০৮ নম্বর কক্ষের সামনে এসে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সেখানে কারও আবেদন গ্রহণ করা হলেও অনেকের আবেদন ফেরত দিয়ে নতুন কাগজপত্র আনতে বলা হচ্ছে।

সেবা নিতে আসা মো. শুকুর আলী দৈনিক সচিত্র সিলেটকে জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর জন্মসাল ২০০৪। বয়স ২২ বছর হলেও পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাঁর বয়সের মিল নেই বলে আবেদন গ্রহণ করেননি। তাঁকে অতিরিক্ত ডকুমেন্ট হিসেবে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও নাগরিক প্রত্যয়নপত্র দিতে বলা হয়েছে।

শুকুর আলী বলেন, “আমার জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার পরও আমার আবেদন গ্রহণ করেননি। দায়িত্বে যিনি আছেন, তিনি বলেন আমার বয়সের মিল নেই। সেজন্য আমাকে এক্সট্রা ডকুমেন্ট হিসেবে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও নাগরিক প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে। তা না হলে আমার আবেদন গ্রহণ করবেন না।”

একই অভিযোগ করেন পাসপোর্ট অফিসে আসা আরেক সেবাগ্রহীতা জুবায়ের। জাতীয় পরিচয়পত্রে একই বয়স থাকার কারণে তিনিও পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে পারেননি বলে জানান।

অন্যদিকে পাসপোর্ট অফিসের দ্বিতীয় তলায় গোলাপগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা উজ্জলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি পাশের একটি অনলাইন দোকান থেকে পাসপোর্টের আবেদন করে এসেছেন। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, আবেদন করার পর তাঁকে লাইনে দাঁড়িয়ে বা অন্য কোনো কাজ করতে হয়নি। অনলাইন দোকানের একজন ব্যক্তি পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তাঁর প্রয়োজনীয় কাজ করে দিয়েছেন।

উজ্জল বলেন, “আমি প্রবাসে থাকি, সেখানে আমার সিটিজেনশিপ রয়েছে। শুধুমাত্র হজ করার জন্য আমার বাংলাদেশি পাসপোর্ট করা। হয়রানির শিকার না হওয়ার জন্য অনলাইনের দোকানের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করেই এসেছি। সহজেই আমার কাজটি তারা করে দিয়েছেন। আমাকে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। সরাসরি কাজটি হয়ে গেল।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট অফিসে দালালের মাধ্যমে কাজ করালে অনেক কিছুই সহজে করা সম্ভব। এমনকি অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে বয়সের অসঙ্গতি থাকলেও পাসপোর্ট করা সম্ভব বলে সূত্রটি দাবি করে। বয়স কোনো বিষয় নয়, তবে এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা প্রয়োজন বলেও সূত্রের দাবি।

গত রবিবার আম্বরখানা এলাকার জেনান নতুন পাসপোর্টের জন্য অনলাইনে আবেদন করে নির্ধারিত ফি দিয়ে অফিসে যান। তিনি জানান, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদন জমা দেওয়ার পর তাঁকে ১০০ নম্বর কক্ষ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভেরিফিকেশন কপি আনতে বলা হয়। ভেরিফিকেশন কপি নিয়ে এসে আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান তিনি। পরে জাতীয়তা সনদ নিয়ে আসতে বলা হয়।

পরদিন জাতীয়তা সনদ নিয়ে গেলে সই-স্বাক্ষর করে তাঁকে ১০৩ নম্বর কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে তিনি আবেদনে একটি অক্ষরের ভুল দেখতে পান। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানালে আবেদন কপি ছুড়ে ফেলে দিয়ে শুদ্ধ করে আবার আবেদন নিয়ে আসতে বলা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাসপোর্ট অফিসে ‘কন্ট্রাকে’ কাজ করান এমন এক ব্যক্তি বলেন, দালালের মাধ্যমে গেলে এত ভোগান্তির প্রয়োজন হয় না। আবেদনে ভুল থাকলেও পাসপোর্ট অফিস থেকেই তা সংশোধন করা হয়। তিনি জানান, নিজে নিজে করতে গেলে আবেদনকারীদের এসব ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ওই ব্যক্তি আরও বলেন, দালালের মাধ্যমে আবেদন করালে তাদের একটি নির্দিষ্ট ‘মার্কা’ থাকে। সেই ‘মার্কা’ থাকলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন দিলেই পাসপোর্টের আবেদন জমা হয়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের আরও দাবি, পাসপোর্ট অফিসের টাকা প্রতি মঙ্গলবার ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় এবং সেই টাকা ‘টপ টু বটম’ সবার পকেটে যায়।

পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০৮ নম্বর কক্ষে পাসপোর্টের আবেদন জমা নেওয়া হয় এবং সেখানেই আবেদন গ্রহণ বা বাতিল করা হয়। আবেদন গ্রহণের পর ফিঙ্গারপ্রিন্টের জন্য পুরুষ আবেদনকারীদের ১০৩ ও নারী আবেদনকারীদের ১০৪ নম্বর কক্ষে পাঠানো হয়। তবে ‘মার্কা’ নিয়ে আসা আবেদনকারীদের জন্য ২০৮ নম্বর কক্ষে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর যারা নিজেরা আবেদন করেন, তাদের অন্য নির্ধারিত কক্ষ ‘১০৩’ গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি দিতে হয়।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্ধারিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ ই-পাসপোর্ট ফি অনুযায়ী, ৪৮ পৃষ্ঠা ও পাঁচ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সাধারণ ফি ২১ দিনে ডেলিভারিতে ৪ হাজার ২৫ টাকা, জরুরি ১০ দিনে ৬ হাজার ৩২৫ টাকা এবং সুপার এক্সপ্রেস দুই দিনে ৮ হাজার ৬২৫ টাকা। একই পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের ফি যথাক্রমে ৫ হাজার ৭৫০, ৮ হাজার ৫০ ও ১০ হাজার ৩৫০ টাকা।

৬৪ পৃষ্ঠা ও পাঁচ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সাধারণ, জরুরি ও সুপার এক্সপ্রেস ফি যথাক্রমে ৬ হাজার ৩২৫, ৮ হাজার ৬২৫ ও ১২ হাজার ৭৫ টাকা। আর ৬৪ পৃষ্ঠা ও ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের ফি যথাক্রমে ৮ হাজার ৫০, ১০ হাজার ৩৫০ ও ১৩ হাজার ৮০০ টাকা।

তবে দালাল ও কিছু ট্রাভেল এজেন্সি ‘অফিস ফি’ এবং ঝামেলা ছাড়াই আবেদন জমা দেওয়ার কথা বলে পাসপোর্টের ধরনভেদে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশোধনের ক্ষেত্রে এ অর্থ ‘ছয় ডিজিট’ পর্যন্ত নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে পাসপোর্ট অফিস থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কিছু নামসর্বস্ব গণমাধ্যমের পরিচয়ধারী সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও। অভিযোগ রয়েছে, তারা পাসপোর্ট অফিসের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে একটি দালাল চক্র তৈরি করেছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পাসপোর্ট করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ছাড়া কয়েকজন সাংবাদিক প্রতিদিন পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে অবস্থান করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজনের অভিযোগ- আবেদনের সামারি পেইজ বা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট তথ্যের কোথাও নির্দিষ্টভাবে সব কাগজপত্রের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু অফিসে গেলে একেক সময় একেক ধরনের কাগজপত্র চাওয়া হয়। এতে সেবা নিতে এসে তাদের বিপাকে পড়তে হয়। তারা জানান, অনেকের ক্ষেত্রে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে, আবার অন্যদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট আবেদনের সঙ্গে আবেদনপত্রের সারাংশের প্রিন্ট কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্মনিবন্ধন নম্বর ও পেমেন্ট স্লিপ দেওয়ার কথা রয়েছে। নবায়নের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পাসপোর্ট ও ডাটা পেজের প্রিন্ট কপি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে জিও বা এনওসি প্রয়োজন। তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদনের উপর স্বাক্ষর করেন পাসপোর্ট অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম পাটওয়ারী। তিনি বলছেন, শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে, সেক্ষেত্রে আলাদা করে জাতীয়তা সনদ চাওয়ার কোনো কারণ নেই।

বয়স কম বা বাড়ানোর আবেদন কীভাবে গ্রহণ করা হয়- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক সময় বয়সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তার আবেদন গ্রহণ করা হয় না। তবে অতিরিক্ত টাকার বিনিময় বা দালালের মাধ্যমে আসলে আবেদন জমা হচ্ছে প্রসঙ্গে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তিনি অফিসের উপপরিচালকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে তিনি জানান, প্রতিদিন নতুন, নবায়ন ও সংশোধন মিলিয়ে প্রায় ৫শর মতো আবেদন জমা হয়।

পাসপোর্ট অফিসে কীভাবে আবেদন জমা হয় এবং দালাল ছাড়া পাসপোর্ট করতে গেলে কেন আবেদনকারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়- এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদা কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি সব প্রশ্নের উত্তরে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়ে আবেদন করার কথা বলেন।

৫ আগস্টের পরে এদেশে হক-বাতিল চিহ্নিত হয়ে গেছে: হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী
বিশ্ব পোলিও দিবসে সিলেটে রোটারির র‌্যালি
পুসাগের নবীনবরণ, সংবর্ধনা ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠান
সিলেটের চুরির মামলার আসামি সুনামগঞ্জ থেকে গ্রেফতার
মাধবপুরে সবুজ দিগন্তজুড়ে ছড়িয়েছে চাষিদের রঙিন স্বপ্ন
আজমিরীগঞ্জে পরিত্যক্ত গুদামে পৌরসভার কার্যক্রম
সুনামগঞ্জে নারী ইউএনওকে নিয়ে পুরুষ এসিল্যান্ডের ‘বিরহী’ পোস্ট, তোলপাড়
হেমন্তে সিলেটে বৃষ্টির আভাস
পরিবেশ রক্ষায় গবেষণা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান: ড. আনোয়াারুল
সুস্থ-সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে সরকারের পাশাপাশি সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগ জরুরি: এমপি এমরান চৌধুরী