মতামত
০৫ই মে, ২০২৬
নঈয়ূম মিয়া
মাটির বুকে যখন প্রথম দাগ কেটে লাঙলের রেখা টেনে দিয়েছিল কৃষক, তখন তার চোখে ছিল আকাশভরা বিশ্বাস। এক মুঠো বীজে সে বুনেছিল আগামী দিনের নিঃশ্বাস। ঘামের লবণে ভিজেছিল তার শরীর, সূর্যের আগুনে পুড়েছিল তার স্বপ্ন,
তবুও সে থামেনি। কারণ প্রতিটি চারা ছিল তার সন্তানের মতো, প্রতিটি সবুজে ছিল বেঁচে থাকার যুক্তি। কিন্তু হঠাৎ আকাশ যেন নিজের ভাষা ভুলে গিয়ে অবিরাম কাঁদতে শুরু করল। বৃষ্টি আর বজ্রপাতের অন্তহীন শোরগোলে ডুবে গেল জমি, ডুবে গেল সময়। ধান দাঁড়িয়ে থেকেও আর ধান নয়, জলে ভিজে হয়ে উঠছে অন্য কোনো জন্মের ইঙ্গিত। চারা হয়ে ফিরে আসছে নিজের শরীরে, যেন প্রকৃতি বলছে, “তোমার ফসল এখনো প্রস্তুত নয়।” শ্রমিক সংকট, কাস্তের ধার থেমে থাকে কাদার ভেতর। ফলে মেশিন নামে না জমিতে। কৃষকের চোখে জমে ওঠে লবণাক্ত প্রশ্ন—
“আমি কি ভুল করেছিলাম বীজ বুনে?”
রোদ নেই। যারা কিছু কেটে আনতে পারে, তাদের উঠোনে শুকোয় না ধান। ভেজা ধানে জন্ম নেয় নতুন অঙ্কুর। ফসল হয়ে ওঠে নিজেরই ব্যর্থ প্রতিচ্ছবি। এই কান্না শুধু কৃষকের নয়। এই কান্না মাটির, জলের, আকাশের—যেখানে ভারসাম্য ভেঙে গেছে অদৃশ্য কোনো হাতে।
দোষ কার?
আকাশ কি এতটাই নিষ্ঠুর? নাকি আমরাই বদলে দিয়েছি তার ছন্দ?
নদীর পথ রুদ্ধ করেছি, গাছ কেটে দিয়েছি নির্বিচারে, ধোঁয়ায় ঢেকেছি বাতাস।
প্রকৃতি কি তবে তার উত্তর দিচ্ছে আজ?
প্রতিকার কোথায়?—প্রশ্নটি ঝরে পড়ে প্রতিটি বৃষ্টিধারায়। উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের হাতেই,
যেখানে আবার গাছ লাগাতে হবে, নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার পথ এবং মাটিকে দিতে হবে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ।
আজকের করণীয়—
কৃষকের পাশে দাঁড়ানো, তার ক্ষতি ভাগ করে নেওয়া, একসাথে হাতে হাত রেখে বলা—
“তুমি একা নও।”
কারণ যে মানুষ মাটিতে স্বপ্ন বুনে, তার কান্না যদি আকাশ ছুঁয়ে যায়। তবে একদিন সেই আকাশই রোদ হয়ে ফিরে আসবে। আর নতুন করে লেখা হবে ধানের শীষে জীবনের কবিতা।
যখন মাঠ ডুবে যায়, আর ধান জলের নিচে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়, তখন শুধু প্রকৃতি দায়ী থাকে না—
নীরবতারও একটি মুখ থাকে, তার নাম—রাষ্ট্র।
কৃষক যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদে তখন
তার কান্না শুধু বৃষ্টির সাথে মিশে যায় না। তা গিয়ে পড়ে সিদ্ধান্তহীন টেবিলের ওপর যেখানে ফাইল জমে থাকে কিন্তু জরুরি সময় থেমে থাকে না। রাষ্ট্রের কাজ শুধু দূর থেকে দেখা নয়, মানচিত্রে রঙ চিহ্নিত করা নয়। রাষ্ট্র মানে সেই হাত—যে হাত বিপদের সময় কাঁধে রাখা যায়। আজ প্রয়োজন ঘোষণা নয়, উপস্থিতি। শব্দ নয়, কার্যকর স্পর্শ। ক্ষতির হিসাব পরে হবে, এখন দরকার কৃষক বাঁচানো। যে মানুষ নিজের জীবন বুনেছিল মাটির ভেতর। যদি ভেজা ধান শুকাতে না পারে, তবে রাষ্ট্রের উচিত রোদ হয়ে নামা। অন্তত এমন ব্যবস্থা করা যেখানে মানুষের চেষ্টা অপচয় না হয়। যদি শ্রমিক না আসে, যদি মেশিন থেমে যায়, তবে রাষ্ট্রের উচিত সেই শূন্যস্থান পূরণ করা।
সহায়তা দিয়ে, প্রযুক্তি দিয়ে অথবা শুধু পাশে দাঁড়িয়ে। কিন্তু দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। এই দুর্যোগ কোনো একদিনের ভুল নয়। এ এক দীর্ঘ অবহেলার ফল। যেখানে নদীকে বেঁধে রাখা হয়েছে, সবুজকে কেটে ফেলা হয়েছে। আর উন্নয়নের নামে ভারসাম্য হারানো হয়েছে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই দায়িত্ব নেয়, তবে তাকে শুধু ক্ষত সারাতে হবে না। কারণ খুঁজে সেখানেই দাঁড়াতে হবে—যেখানে ভুল শুরু হয়েছিল। নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার চলার স্বাধীনতা, মাটিকে দিতে হবে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ,
আর মানুষকে শেখাতে হবে—প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে নয়, সহযোগিতা করে বাঁচতে হয়।
আজকের করণীয় খুব সরল—
কৃষকের পাশে দাঁড়ানো, তার ক্ষতিকে নিজের ক্ষতি ভাবা। আর তাকে জানানো—এই লড়াইয়ে সে একা নয়। কারণ রাষ্ট্র যদি শুধু কাঠামো হয়ে থাকে, তবে তা ভেঙে পড়ে সময়ের ভারে।
কিন্তু যদি তা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ হয়, তবে সেটাই হয়ে ওঠে আশ্রয়। আর যে দেশে কৃষকের কান্না অশ্রুত থাকে, সে দেশ ধীরে ধীরে নিজের ভিত্তি হারায়। তাই এখনই সময় রাষ্ট্র যেন কেবল শাসন না করে মানুষ হয়ে ওঠে, কৃষক হয়ে ওঠে।
সচিত্র সিলেট / আব্দুল খালিক