লিড
২৫ই জুলাই, ২০২৬
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবিতে সিলেটে শনিবার (২৫ জুলাই) ১০ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশের প্রধান অতিথি জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সব বক্তাই সরকারের প্রতি হুমকি-ধমকি আর হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।
তারা বলেন- গণভোটের গণরায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বর্তমান সরকার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে না।
(২৫ জুলাই) দুপুর দেড়টায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দানে আয়োজিত এই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন- জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, দেশে আর কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা হতে দেওয়া হবে না।
তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ করছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণ ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
তিনি বলেন- হাসিনাকে তাড়িয়েছি। যদি আবার ফ্যাসিবাদ কায়েমের চেষ্টা করা হয়, জনগণ আপনাদেরও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবে। আমরা আমাদের শহীদ, জুলাই যোদ্ধা ও আহত পরিবারের সঙ্গে কোনো বেইমানি করব না।
তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষ আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায় করতে শিখেছে। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও আমরা আমাদের অঙ্গীকার রক্ষা করব।
গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। সেই গণরায় বাস্তবায়ন না হলে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অসম্মান করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা গণভোটকে অপমান করতে দেব না। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই আমাদের আন্দোলন সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে। বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ চাই না।’
সিলেটবাসীর প্রতি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সামনে আন্দোলনের ডাক আসবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
কর্মীদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন- দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও চরিত্রহীন রাজনীতির অবসান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। মুক্তির লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা থামব না।
ডা. শফিকুর রহমান সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে জনদুর্ভোগ লাঘব, স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণ এবং সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানান। তিনি অঙ্গীকার করেন, ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে এই ১১ দলীয় জোট অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিলেটের এসব দাবি বাস্তবায়ন করবে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম)।
গণভোটের গণরায় অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার করা না হলে বর্তমান সরকার তাদের পূর্ণাঙ্গ ৫ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও।
সরকারের প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি কি পাঁচ বছর নির্বাচিতভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান, নাকি শেখ হাসিনাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারদের মতো জনগণের রায়কে উপেক্ষা করার করুণ পরিণতি ভোগ করতে চান—সেই সিদ্ধান্ত তারেক রহমানকেই নিতে হবে।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ রায় দিলেও বর্তমান সরকার তা উপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর বিশ্বের অন্যান্য দেশ ছাত্র-জনতার প্রতি সতর্ক ও শ্রদ্ধাশীল হলেও বাংলাদেশের সরকার সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে। ভারতে ছাত্র আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সেখানে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন জানান এবং দেশের সরকারকে সতর্ক করেন।
বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, দলটি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে '৩১ দফা'র মুলা ঝুলিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ক্ষমতার আসার পর তারা সংস্কারের প্রশ্ন ভুলে কেবল সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। অথচ ঐকমত্য কমিশনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, শুধু সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন সম্ভব নয়; তার জন্য সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদ প্রয়োজন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিএনপি যদি জুলাই বিপ্লব, ছাত্র-তরুণদের রক্ত ও হাজারো মানুষের আত্মত্যাগকে ভুলে যায়, তবে এর নির্মম পরিণতি তাদেরকেই ভোগ করতে হবে।
দেশের বর্তমান গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক বাজেটে মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝার কঠোর সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি দাবি করেন, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার না করার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত সহায়তাও পাওয়া যাচ্ছে না।
একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন অথবা বর্তমান কমিশনকে অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জানান তিনি। সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের অভিযোগ এনে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে রাজশাহী থেকে শুরু হওয়া ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচির সমাপনী আয়োজন ছিল সিলেটের এ সমাবেশ।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল কাইয়ুম সুবহানী, খেলাফত আন্দোলনের আমির হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আমজাদুল ইসলাম চান।
এছাড়াও সমাবেশে জামায়াতে ইসলামি এবং তাদের সহযোগী ১০ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশ বেলা ২টা থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় বিকাল ৫টায়।