মতামত
০২ই জুলাই, ২০২৬
দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আমাদের সিলেটিসহ সব জেলা থেকে যাওয়া রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। দিন-রাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তারা যে অর্থ দেশে পাঠান, তা দিয়ে সচল থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, দেশের জন্য নিরলসভাবে রক্তপানি করা এই প্রবাসীদের একের পর এক মৃত্যুর খবর আমাদের প্রতিনিয়ত ব্যথিত করছে। সম্প্রতি কাতারে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেটের ৫ প্রবাসীর মৃত্যু সেই ক্ষতে নতুন করে এক বড় আঘাত।
মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া এসব প্রবাসীর একটি বড় অংশই অত্যন্ত দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। পরিবারের অভাব দূর করতে, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা মরুভূমির দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু যখন কোনো দুর্ঘটনায় এমন একজন উপার্জনক্ষম মানুষ মারা যান, তখন শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায় না, বরং একটি সম্পূর্ণ পরিবার চিরতরে অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে একমাত্র উপার্জনের মানুষকে হারানোর শোকÑএই দুইয়ের চাপে পরিবারগুলো একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
কাতারে ঘটে যাওয়া এই সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রবাসীদের সুরক্ষায় এবং তাদের পরিবারের পুনর্বাসনে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিকল্পিত ও ব্যাপক উদ্যোগ কতটা জরুরি। প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের উপর দাঁড়িয়ে আমরা গর্ব করি, কিন্তু তাদের বিপদে আমরা কতটা পাশে দাঁড়াচ্ছি, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে।
বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণের কিছু তহবিল বা অনুদান দেওয়া হলেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এজন্য কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো।
জরুরি এককালীন অনুদান :
দুর্ঘটনায় নিহত প্রবাসীর লাশ দেশে আসার পরপরই পরিবারকে বড় অঙ্কের এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত, যাতে তারা তাৎক্ষণিক সংকট ও ঋণের ধাক্কা সামলাতে পারে। বর্তমানে তাৎক্ষণিক একটি অর্থ দেওয়া হলেও তা চাহিদার তুলনায় কম।
মাসিক ভাতা ও পুনর্বাসন :
যেসব পরিবার একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা এবং পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
সহজ আইনি সহায়তা :
বিদেশে মৃত প্রবাসীর বকেয়া বেতন, ইন্সুরেন্স বা ক্ষতিপূরণের টাকা দ্রুত আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় ও প্রবাসীবান্ধব ভূমিকা পালন করতে হবে।
বেসরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা :
শুধু সরকারের ওপর ভরসা করে বসে না থেকে দেশের বেসরকারি খাত, বিশেষ করে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং এনজিওগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রবাসীদের অর্থ দিয়ে যে ব্যাংকিং খাত সমৃদ্ধ হচ্ছে, সেই ব্যাংকগুলোর উচিত সিএসআর (ঈঝজ) ফান্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশ এসব নিভৃত পল্লীর অসহায় প্রবাসী পরিবারের পুনর্বাসনে ব্যয় করা। এছাড়া সিলেটের বিভিন্ন প্রবাসী কল্যাণ সংস্থা এবং বিত্তবানদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ আপদকালীন তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াবে।
আমরা আর কোনো প্রবাসী পরিবারের স্বপ্ন এভাবে ধূলিসাৎ হতে দেখতে চাই না। কাতার দুর্ঘটনায় নিহত রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করার পাশাপাশি আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি-রাষ্ট্র এবং সমাজ যেন সর্বোচ্চ সহানুভূতি ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই দরিদ্র পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায়। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা এই বীরদের ঋণ শোধ করার এখনই সময়।
আপলোড : আব্দুল খালিক