মতামত
৩০ই জুন, ২০২৬
সিলেট মহানগরের ফুটপাত হকারমুক্ত করা এবং যানজট নিরসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা ও উচ্ছেদ অভিযান চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিছুদিন পর পর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও তা হকার সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারছে না। অভিযান শেষ হতে না হতেই ফুটপাতগুলো আবারও চলে যায় হকারদের দখলে। ফলে পথচারীদের ভোগান্তি এবং যানজটের তীব্রতা দিন দিন কেবল বাড়ছেই। এই সংকটের একটি স্থায়ী ও মানবিক সমাধান এখন সময়ের দাবি।
ফুটপাত মূলত পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য। কিন্তু হকারদের অনিয়ন্ত্রিত বসার কারণে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হয়, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সাথে সড়কের একটি বড় অংশ হকারদের দখলে থাকায় নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। তবে এই সমস্যার আরেকটি মানবিক দিকও রয়েছে—হকারদের সিংহভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য, যারা জীবিকার তাগিদে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাস্তায় বসেন। তাই কেবল জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা।
হকার সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি নিখুঁত ডেটাবেজ তৈরি করা। প্রকৃত হকারদের চিহ্নিত করে তাদের পরিচয়পত্র প্রদান করা জরুরি, যাতে বহিরাগত বা মৌসুমী কোনো চক্র এর সুযোগ নিতে না পারে। এরপর সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনের উদ্যোগে নির্দিষ্ট স্থানকে (ধোপাদিঘীরপাড়স্থ) হকার্স মার্কেটকে পুরোদমে সংস্কার করে ব্যবসর উপযোগী করে গড়ে তোলা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক উন্নত ও জনবহুল শহরে নির্দিষ্ট দিন বা নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন—সন্ধ্যা বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে) হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া হয়। সিলেটেও এভাবে স্থাপন করা সম্ভব।
পাশাপাশি, উচ্ছেদ হওয়া ফুটপাতগুলো যাতে পুনরায় বেদখল না হয়, সে জন্য প্রশাসনের কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ। হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে শুধু উচ্ছেদ করলে তারা পেটের তাগিদে আবারও রাস্তায় ফিরবে—এটাই স্বাভাবিক।
সিলেটকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন এবং পর্যটনবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ফুটপাত অবমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই উন্নয়ন যেন কাউকে ক্ষুধার্ত না রাখে। মানবিক পুনর্বাসন এবং কঠোর আইনি নজরদারির সমন্বয়েই কেবল সিলেটের হকার সমস্যার একটি চিরস্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান সম্ভব। সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এই বিষয়ে একটি টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।