মতামত

জাতীয় বেতনস্কেলে ইমাম-খতিবদের বেতন-ভাতা প্রত্যাশা

Icon
মো. রেজাউল হক ডালিম:

২৯ই জুন, ২০২৬

জাতীয় বেতনস্কেলে ইমাম-খতিবদের বেতন-ভাতা প্রত্যাশা

বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে মসজিদ এবং এর সাথে যুক্ত ইমাম ও খতিবদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রতিদিন কোটি কোটি মুসলিমকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নেতৃত্ব দেওয়া থেকে শুরু করে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসারে ইমাম-খতিবরা সম্মুখসারির কারিগর হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত এই স্থানটিতে যারা আসীন, তাদের একটি বড় অংশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আজও চরম অবহেলার শিকার। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের লাখো ইমাম ও খতিবদের পক্ষ থেকে একটি জোরালো দাবি উঠছে—তাদেরকে সরকারি জাতীয় বেতনস্কেলের আওতায় এনে নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা প্রদান করা হোক। এই দাবিটি কি আদেও বাস্তবায়ন সম্ভব, নাকি এটি কেবলই এক দূরবর্তী 
অরণ্যে রোদন?

দাবির পটভূমি ও ইমামদের বর্তমান অর্থনৈতিক দশা :

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় তিন লাখের বেশি মসজিদ রয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি বা বড় কেন্দ্রীয় মসজিদ ছাড়া 

সিংহভাগ মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের বেতন নির্ধারিত হয় স্থানীয় মসজিদ কমিটির খেয়ালখুশি এবং মসজিদের নিজস্ব ফান্ড বা কালেকশনের ওপর ভিত্তি করে। গ্রামাঞ্চলে বা মফস্বল শহরের অনেক মসজিদে একজন ইমামের মাসিক সম্মানী তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা, যা বর্তমান বাজারের আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের এই সময়ে একজন মানুষের একক খরচের জন্যও পর্যাপ্ত নয়, পরিবারের ভরণপোষণ তো দূর কি বাত।

সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি বিশাল অংশকে যারা প্রতিনিয়ত সুশৃঙ্খল ও নৈতিকতার পাঠ দিচ্ছেন, তাদের নিজেদের জীবন কাটে চরম আর্থিক অনটনে ও অপমানে। এই চরম বৈষম্যের কারণেই ইমাম-খতিবরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের শ্রম ও মর্যাদার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছেন এবং তাদের জাতীয় বেতনস্কেলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছেন।

বাস্তবায়ন কি সম্ভব? আইনি ও কাঠামোগত জটিলতা :

ইমাম-খতিবদের এই দাবিটি আবেগ ও সামাজিক যৌক্তিকতার দিক থেকে শতভাগ সত্য হলেও, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি জটিলতা রয়েছে।

বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থাপনা:

দেশের ৯৫ শতাংশের বেশি মসজিদ সম্পূর্ণ স্থানীয় জনগণের অর্থায়নে এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। সরকারি কোনো দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরাসরি এই মসজিদগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই। রাষ্ট্রীয় বেতনস্কেলে কাউকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে তাকে সরকারি বা আধা-সরকারি কর্মচারী হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিতে হয়। দেশের ৩ লাখেরও বেশি মসজিদের প্রায় ৬ থেকে ৯ লাখ জনবলকে (ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন, খাদেম) রাতারাতি সরকারি রাজস্বখাতের আওতায় আনা কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত জটিল।

বিশাল অর্থনৈতিক বাজেট:

লাখ লাখ ইমাম-খতিবকে যদি জাতীয় বেতনস্কেলের সর্বনিম্ন গ্রেডেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে প্রতি মাসে এবং প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। উন্নয়নশীল একটি দেশের বাজেটে এই বিশাল পরিমাণ স্থায়ী অর্থনৈতিক বরাদ্দ যুক্ত করা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পূর্ববর্তী উদ্যোগ ও সম্ভাব্য সমাধানের পথ :

ইমামদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা যে একেবারে হয়নি, তা নয়। সরকার 'ইমাম ও মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট' গঠন করেছে, যার মাধ্যমে প্রতি বছর নির্দিষ্ট কিছু ইমামকে এককালীন অনুদান বা ঋণ দেওয়া হয়। তবে তা সামগ্রিক সংকটের তুলনায় সমুদ্রে বারিবিন্দুর মতো। এছাড়া দেশের প্রতিটি উপজেলা ও জেলায় মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে ইমাম-খতিবদের সরকারি স্কেলে বা নির্দিষ্ট সম্মানীতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটি মোট মসজিদের তুলনায় খুবই সামান্য।

তাহলে এই সংকটের চিরস্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান কোন পথে? পুরো জনবলকে সরকারি রাজস্বখাতে একবারে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও একটি মধ্যপন্থা 

অবলম্বন করা যেতে পারে:

১. ক্যাটাগরিভিত্তিক অনুদান প্রথা:

সরকার মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মতো 'এমপিওভুক্ত' (Monthly Pay Order) করার আদলে মসজিদগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে পারে। যেখানে ইমাম ও খতিবদের বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন ৫০% বা ৭০%) সরকার প্রদান করবে এবং বাকি অংশ স্থানীয় মসজিদ কমিটি বহন করবে।

২. ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তহবিল পুনর্গঠন: 

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় 'মসজিদ ফান্ড' গঠন করা যেতে পারে, যেখানে ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে আয়, যাকাত ফান্ড এবং সরকারি বিশেষ বরাদ্দ জমা হবে। এই ফান্ড থেকে দেশের পিছিয়ে পড়া ও গ্রামীণ অঞ্চলের ইমামদের নুন্যতম একটি স্ট্যান্ডার্ড ভাতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

৪. মসজিদ কমিটির জবাবদিহিতা: 

সরকারিভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত, যাতে দেশের কোনো মসজিদ কমিটিই তাদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের একটি নির্দিষ্ট নূন্যতম মজুরির (Minimum Wage) নিচে বেতন দিতে না পারে।

শেষ কথা :

ইমাম-খতিবদের জাতীয় বেতনস্কেলে যুক্ত করার দাবিটি শতভাগ সরকারিভাবে বাস্তবায়ন করা হয়তো রাতারাতি সম্ভব নয় এবং নিকট ভবিষ্যতে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন কিছুটা দূরহ। তবে রাষ্ট্র চাইলে সদিচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আংশিক বা পরোক্ষভাবে এই দাবি পূরণ করতে পারে। যারা আমাদের সমাজের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক স্তম্ভ, তাদের ক্ষুধার্ত রেখে একটি উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়। ইমামদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের পেশাদারিত্বের মর্যাদা রক্ষায় সরকারকে অবশ্যই একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক  : বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সচিত্র সিলেট
প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক : সিলেট জেলা প্রেসক্লাব


আপলোড: শিউলি