মতামত
১৮ই জুন, ২০২৬
সিলেটের মোয়াজ আফসার- এক নামে যাকে চিনে সিলেটের সাহিত্য পাড়া। ভ্রমন লেখক হিসেবে বর্তমান সিলেট একজনকেই ভালোভাবে চিনি। আর সেই নামটি হচ্ছে-মোয়াজ আফসার। দৈনিক সুরমা মেইলের সাহিত্য সম্পাদক মোয়াজ আফসার তার ভ্রমণের চিত্ত সুখ নিত্য নিত্য পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন। মোয়াজ আফসারের ভ্রমণ কাহিনী পাঠকের মনকে যেমন প্রফুল্ল রাখে, তেমনি ভ্রমণ পিপাসুদের ভ্রমণের আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। মোয়াজ ভাই লিখে লিখে মানুষের মনে তৃপ্তি দিয়ে ভ্রমণে উৎসাহ সৃষ্টি করা একজন মানুষ। একটু বিশেষায়িত করলে তিনি এক্ষেত্রে একজন সফল মানুষ।
সিলেট শহরেই মোয়াজ আফসারের জন্ম,শৈশব ও কৈশোরের স্বর্ণালী সময়গুলো কেটেছে। সিলেট শহরের ভূমিপুত্র আজকের ভ্রমণলেখক মোয়াজ আফসার- যিনি ১৯৬৩ সালে সিলেট শহরের একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
মোয়াজ আফসারের লিখালিখির শুরুটা কবিতা, ছড়া লিখে। তখন তিনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তখন আশির দশক। আশির দশকের শুরুতে তিনি ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয় গামী ছাত্র। সিলেটের বন্দর বাজারে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রাজা জিসি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন এই মোয়াজ আফসার। সেদিনের সেই ছোট্ট মোয়াজ পড়াতে যেমন ছিলেন মেধাবী, ঠিক তেমনি সৃজনশীলতায়ও ছিলেন উদ্বুদ্ধ। মোয়াজ সে সময় যা লিখতেন, তা পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিতেন। পত্রিকায় ছাপালে প্রচন্ড আনন্দ অনুভুব করতেন। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য তীর্থ কেমুসাসের বর্তমান সাধারন সম্পাদক সেলিম আউয়াল ছিলেন তার সেই সময়ের সহপাঠী। সেই থেকে অদ্যবধি তাদের বন্ধৃত্ব বহমান। প্রায় পাঁচ দশকের কাছাকাছি তাদের বন্ধুত্বের বয়স। সিলেটের সাহিত্যের এই দুই কালজয়ী কীর্তিমান প্রায় অর্ধশতক ধরে হাতে হাত রেখে একসাথে হাটছেন এবং নিত্য নতুন সৃজনের মাধ্যমে পাঠক সমাজের মনের খোরাক দিচ্ছেন,তা নিশ্চয়ই আমাদের কাছে অনেক গর্বের একটি প্রাপ্তি। প্রায় পঞ্চাশ বছরের বন্ধুত্বের বয়স নিয়ে দুই সাহিত্যিক একই বৃত্তে থেকে আজ সিলেটের জনপ্রিয় দৈনিক সুরমা মেইল পত্রিকার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
মোয়াজ আফসার ও সেলিম আউয়ালের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সেই আশির দশকে গড়ে উঠে বর্তমান সময়ে সিলেটের জনপ্রিয় সাহিত্য সংগঠন ‘সাইক্লোন’। এই সাইক্লোন আজ সিলেটের একটি প্রতিষ্টানে রূপ নিয়েছে। যে সাইক্লোন একদিন ছিল স্কুলগামী মোয়াজ আফসার, সেলিম আউয়ালদের উৎকৃষ্ট সময় কাটানো প্রয়াসে বৈকালিক একটি আড্ডা সংঘ হিসেবে যেই সাইক্লোন আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে প্রতিষ্টা করেছিলেন,সেই সাইক্লোন আজ একটি সাহিত্য তীর্থ। সাইক্লোনে এসে সিলেটের কবি,সাহিত্যিকরা স্নাত হন। সিলেটের অনেক গুণী কবি সাহিত্যিকের জন্ম দিয়েছে এই সাইক্লোন।
আশির দশকের কিশোর মোয়াজ শুধু এখানেই থেমে থাকেননি। সেই সময় তিনি ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রতিষ্টা করেন সিলেটের প্রথম ব্যান্ড সংগঠন-‘জাগরণী’। মোয়াজ আফসার ছিলেন সেই দলের মূখ্য কন্ঠশিল্পী। মোয়াজ আফসারের জাগরণী সেই সময় সিলেটের শিক্ষিত কিশোর ও যুব সমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিক জাগরণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলো। তখনকার এই ছিল জাগরণী নামকরনের স্বার্থকতা।
সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি মোয়াজ আফসারের সংগীত চর্চাও অদ্যবধি চলমান রয়েছে। মোয়াজ আফসার তার কন্ঠে নজরুল গীতি অনন্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে মোয়াজ আফসার তার জীবনকে প্রতিষ্টা করার স্বপ্নে সুদুর বিলেত চলে যান। বিলেতে গিয়েও সাহিত্যে তার মনপ্রাণ নিবেদিত ছিল। মোয়াজ আফসার বিলেতে তার দীর্ঘ সময়ের প্রবাস জীবনের সুখ দুঃখের গল্প নিয়ে লিখতে বসেন। বিলেতের জীবন নিয়ে প্রায় ২৫ বছর লিখে মোয়াজ আফসারের জীবনের সবচেয়ে সফল ও একমাত্র বই "শেক্সপিয়ারের দেশে" বইটি পূর্ণাঙ্গ করেন। এই বইটি লিখতে গেয়ে কত সংযোজন,বিয়োজন করতে হয়েছে তার। আবার বইটি লিখতে গিয়ে কতরাত নিদ্রাহীন থেকেছেন-তার কোন সঠিক হিসেব নেই। একজন লেখক কতটুকু সাহিত্যপ্রেমী ও সাহিত্য সাধক ও অনুচিন্তক হলে এমনটা করতে পারেন--তা মোয়াজ আফসারের এই বই লিখার স্মৃতিচারন অনুমান করা যায়। একটি বই রচনার জন্য সূদীর্ঘ ২৫ বছরের সমুদ্র যাত্রার মতো। লেখকের বিশ্বাস ছিল--তার তরনীটি তীরে এসে ভিড়বেই। লেখকের আত্মবিশ্বাস ও ২৫ বছরের সাধনায় প্রকাশ তার "শেক্সপিয়ারের দেশে" বইটি। যেখানে আজকালকার লেখকগণ বছরে ৫/৭টি বই লিখে ফেলেন,যার বেশীরভাগই মানহীন। সেক্ষেত্রে ভ্রমণ লেখক মোয়াজ আফসার অদ্যবধি পর্যন্ত তার একমাত্র এই বইটির জন্য জীবনের ২৫ টি বছর লাগিয়েছেন। তার এই দীর্ঘ সময় লাগার মূল কারন -একটি উৎকৃষ্ট সাহিত্য সাধনা ও দর্শনকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। তিনি সেটি করেছেন এবং সফল হয়েছেন।
ভ্রমন লেখক মোয়াজ আফসার সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক মোয়াজের ঘনিষ্ট বন্ধু ও বর্তমানে সময়ের একজন সব্যসাচী প্রবাসী লেখক তাবেদার রসুল বকুল বলেন,"মোয়াজ আফসার সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। শুধু তার সৃজন কর্ম নয়, তার ব্যাক্তিগত গুণাবলীও আমাদের জন্য সম্পদ। তাছাড়া মোয়াজ আফসার সিলেটের জনপ্রিয় যে পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন,সেই পত্রিকার সাহিত্য পাতাটি বর্তমান সময়ে সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত, পাতা। আর এটা কেবলমাত্র তার কর্ম দক্ষতার কারনেই সম্ভব হয়েছে"।
কেবলমাত্র সাহিত্য প্রেম এবং মা,মাটি ও মানুষের টানে ভ্রমণ লেখক মোয়াজ আফসার বিলেতের সুখ ও প্রাচুর্য্যের জীবন ছেড়ে দেশে স্থায়ী হয়েছে। মোয়াজ আফসার এই সিলেটের সাহিত্যের বিকাশ ও উন্নয়নে এক অনন্য সম্পদ। এই সিলেটের সাহিত্যের বিকাশে হাতেগুণা যে কয়েকজন আন্তরিকভাবে ব্রতি হয়েছেন,তাদের একজন ভ্রমণ লেখক মোয়াজ আফসার। ভ্রমণ লেখক মোয়াজ আফসারের জন্য অহর্ণিত শুভ কামনা। পরিশেষে কবিতার ভাষায়-
মোয়াজ আফসার
মিলন কান্তি দাস
কতদিন কতরাত ভ্রমনেতে পার
ভ্রমনের গুণীজন মোয়াজ আফসার।
ভ্রমনের কাহিনী যে কত লেখা তার
ভ্রমনের কবি তিনি মোয়াজ আফসার।
কথা সদা কম তার কাজে মন তার
সাহিত্যের কর্মবীর মোয়াজ আফসার।
মোয়াজের মনে সদা সাহিত্যের টান
মাঝে মাঝে শোনা যায় তার মুখে গান।
সিলেটের কৃতিজন মোয়াজ আফসার
সাহিত্যের কাজ নিয়ে দিন তার পার।
আপলোড : আব্দুল খালিক