মতামত
০৫ই অক্টোবর, ২০২৬
বার্ষিক/ নির্বাচনী/ প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছে। বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা সিলেবাস শেষ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামুখী করে তুলতে ব্যস্ত। অন্যদিকে অনেক অভিভাবকের মনে বাড়ছে উদ্বেগ, সন্তান ঠিকমতো পড়ছে তো? ভালো ফলাফল করতে পারবে তো? পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত নম্বর না পেলে কী হবে?
কিন্তু অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কখনোই শিক্ষার্থীর ফল ভালো করার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং অনেক সময় অভিভাবকের চাপ, তুলনা, বকাঝকা ও অতিরিক্ত প্রত্যাশা শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষাভীতি তৈরি করে। ফলে বই সামনে থাকলেও পড়ায় মন বসে না।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভয় নয়, উৎসাহ; চাপ নয়, পরিকল্পনা; তুলনা নয়, সহযোগিতা।
শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ফেরাতে কী করা যেতে পারে?
প্রথমেই শিক্ষার্থীর জন্য একটি বাস্তবসম্মত পড়াশোনার রুটিন তৈরি করতে হবে। একটানা দীর্ঘ সময় পড়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময় ধরে পড়া, ছোট বিরতি নেওয়া এবং বিষয় পরিবর্তন করে পড়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।
প্রতিদিন কী পড়বে, কতটুকু পড়বে এবং কোন বিষয়টি আগে শেষ করবে এ বিষয়ে একটি ছোট তালিকা তৈরি করলে পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। বড় সিলেবাসকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে কার্যকর কৌশল।
শুধু বই পড়ে গেলেই হবে না। পড়া → লেখা → অনুশীলন → ভুল সংশোধন-এই চারটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞানসহ অনুশীলননির্ভর বিষয়ে নিয়মিত লিখে পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও অপ্রয়োজনীয় ভিডিওর ব্যবহারও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময় ও নিয়ম করে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুমও পড়াশোনার অংশ। রাত জেগে পড়ার পরিবর্তে পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার এবং সামান্য শারীরিক ব্যায়াম শিক্ষার্থীর মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সহায়ক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তার নিজের গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
অভিভাবকদের দায়িত্ব কোথায়?
পরীক্ষার সময় অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে শুধু “কত নম্বর পাবে?” এই প্রশ্ন না করে জিজ্ঞেস করা উচিত, “কোন বিষয়টি বুঝতে সমস্যা হচ্ছে?”
সন্তানের পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব। নিরিবিলি জায়গা, নির্দিষ্ট পড়ার সময় এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা দরকার।
কিন্তু অভিভাবকদের একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি অন্যের সন্তানের সঙ্গে নিজের সন্তানের তুলনা করা যাবে না।
“ও এত ভালো করছে, তুমি পারছ না কেন?” এ ধরনের কথা শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসহীন করে দিতে পারে।
পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত চাপ, ভয় দেখানো কিংবা শাস্তির হুমকিও কোনো কার্যকর শিক্ষাপদ্ধতি নয়। ভুল করলে তাকে বোঝাতে হবে, কোথায় সমস্যা হয়েছে এবং কীভাবে তা সংশোধন করা যায়।
অভিভাবকদের উচিত প্রতিদিন সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, কিন্তু সারাক্ষণ পাহারাদারের মতো বসে থাকা নয়। সন্তান যেন নিজের পড়াশোনার দায়িত্ব নিজেই নিতে শেখে সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষকদের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ
পরীক্ষার আগে শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু সিলেবাস শেষ করা নয়; শিক্ষার্থীর মানসিক প্রস্তুতিও নিশ্চিত করা।
শিক্ষককে প্রথমে বুঝতে হবে কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দুর্বল। শ্রেণিকক্ষে দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও আরও ভালো করার সুযোগ দিতে হবে।
পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের ধরন, উত্তর লেখার কৌশল, সময় ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ ভুলগুলো সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া যেতে পারে।
শুধু মডেল টেস্ট নেওয়াই যথেষ্ট নয়। পরীক্ষার পর খাতা বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীকে জানাতে হবে কোথায় ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় কীভাবে তা এড়ানো যায়।
একজন শিক্ষক যদি বলেন, “তুমি পারবে” এই ছোট বাক্যটিও একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার “তোমার দ্বারা হবে না” এমন একটি মন্তব্য একজন শিক্ষার্থীর মনে দীর্ঘদিন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই পরীক্ষার আগে শিক্ষকের কাজ হবে শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করা।
বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে সমন্বয় জরুরি
শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফল শুধু বিদ্যালয় বা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। এটি একটি যৌথ দায়িত্ব।
কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়ছে না, শ্রেণিকাজে পিছিয়ে আছে বা মানসিকভাবে অমনোযোগী এমন তথ্য শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে নিয়মিত বিনিময় হওয়া প্রয়োজন।
অভিভাবক যদি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের সময় শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে অনেক সমস্যাই দেরিতে ধরা পড়ে। নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে শিক্ষার্থীর দুর্বলতা আগেই চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
বার্ষিক/ টেস্ট/ প্রি টেস্ট পরীক্ষা কোনো যুদ্ধ নয়; এটি শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি যাচাইয়ের একটি মাধ্যম। একটি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না হলেই একজন শিক্ষার্থী ব্যর্থ হয়ে যায় না। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও ভালো করার সুযোগই শিক্ষার প্রকৃত সৌন্দর্য।
এই সময়ে আমাদের সন্তানদের ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে হবে।
অভিভাবক হবেন সন্তানের আশ্রয়, শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক আর শিক্ষার্থী হবে নিজের ভবিষ্যতের নির্মাতা।
মনে রাখতে হবে শুধু ভালো ফলাফল নয়, একজন আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও শেখার প্রতি আগ্রহী মানুষ তৈরি করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
তাই আসুন, পরীক্ষার আগে আমরা সন্তানের ওপর দুশ্চিন্তার বোঝা না চাপিয়ে তার পাশে দাঁড়াই। তাকে বলি
“ভয় পেয়ো না, মন দিয়ে চেষ্টা করো। ফলাফল যাই হোক, আমরা তোমার পাশে আছি।”
এই একটি বাক্যই হয়তো কোনো শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও কলামিস্ট।