মতামত
০৫ই অক্টোবর, ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আবাসিক মাদরাসাগুলোতে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নির্যাতনের একের পর এক ঘটনার খবর প্রকাশ পাচ্ছে। কোনো শিশু যখন নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিবারের মায়াময় ঘর ছেড়ে শিক্ষকদের হাতে নিজেদের সঁপে দেয়, তখন সেখানে এমন পৈশাচিক আচরণের শিকার হওয়া কেবল অপরাধই নয়, বরং মানবতা ও বিশ্বাসের চরম অবমাননা। পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেখানে শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেখানে এমন ভীতিকর পরিবেশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অনেক সময় সামাজিক কুসংস্কার, লোকলজ্জার ভয়, পরিবারের ভয়ভীতি এবং অপরাধীদের প্রভাবশালী হওয়ার কারণে অনেক শিশুই এই নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে বাধ্য হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনার পর আইনি পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হওয়া কিংবা আপস-রফার চেষ্টা চালানো অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। মাদরাসায় শিশু নির্যাতনের এই ব্যাধি রুখতে হলে কেবল ক্ষোভ প্রকাশ নয়, বরং এর স্থায়ী প্রতিকারে সমাজ, রাষ্ট্র ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিকারের কার্যকর উপায়সমূহ:
১. তদারকি ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন: আবাসিক ও অনাবাসিক সকল মাদরাসার কমন স্পেস, বারান্দা, শ্রেণিকক্ষ এবং ছাত্রাবাসের প্রবেশদ্বারে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে নিয়মিত বিরতিতে শিক্ষা কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সারপ্রাইজ পরিদর্শন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২. শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ নজরদারি ও ব্যাকগ্রাউন্ড চেক: যেকোনো মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগের পূর্বে তাদের চরিত্র, মানসিক সুস্থতা ও পূর্ববর্তী রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই (ইধপশমৎড়ঁহফ ঈযবপশ) করতে হবে। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন বা শিশু নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে তাঁকে কোনোভাবেই শিশু শিক্ষায় নিয়োজিত রাখা যাবে না।
৩. নিরাপদ অভিযোগ বক্স ও কাউন্সিলিং: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য একটি গোপন ও নিরাপদ ‘অভিযোগ বক্স’ থাকতে হবে, যার চাবি কেবল স্থানীয় প্রশাসন বা ট্রাস্টি বোর্ডের নিরপেক্ষ প্রতিনিধি দলের কাছে থাকবে। এ ছাড়া নিয়মিত বিরতিতে শিশু মনস্তত্ত্ববিদ বা অভিজ্ঞ সমাজসেবকদের দিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করা উচিত।
৪. আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার দ্রুত বাস্তবায়ন: শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের (শিশু আইন ২০১৩ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০) কঠোর ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটলে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা না করে অবিলম্বে পুলিশকে জানানো এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. সচেতনতা বৃদ্ধি ও শিশুদের শিক্ষা: শিশুদের স্পর্শ বা ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত বিষয় নির্দ্বিধায় বাবা-মা বা বিশ্বস্ত কাউকে বলার আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দিতে হবে।
৬. কওমি ও আলিয়া মাদরাসা বোর্ডের বিশেষ ভূমিকা: মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট শীর্ষ আলেম সমাজকে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বহিষ্কার নয়, বরং তাদের আইনি প্রক্রিয়ার সোপর্দ করতে বোর্ড থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
ধর্মীয় শিক্ষার পবিত্রতা রক্ষা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভয়মুক্ত ও নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। মাদরাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (তবৎড় ঞড়ষবৎধহপব) নীতি বজায় রেখে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।