মতামত
০৫ই অক্টোবর, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিশেষ করে সিলেটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান অত্যন্ত সুগভীর ও বিস্তৃত। শুধু রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করাই নয়, সিলেটের সামাজিক, মানবিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে প্রবাসীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত কষ্টার্জিত অর্থ যখন তাঁরা নিজ মাতৃভূমিতে, বিশেষ করে প্রিয় সিলেটে বিনিয়োগ করতে চান, তখন তাঁদের প্রত্যাশা থাকে একটি নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ। তবে বাস্তবচিত্র সবসময় প্রবাসীদের জন্য আশাব্যঞ্জক থাকে না।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, জমি বা আবাসন ব্যবসা, শিল্প-কারখানা কিংবা বাণিজ্যিক উদ্যোগÑপ্রতিটি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে গিয়ে বহু প্রবাসী প্রতারণা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার হন। অনেক সময় ভুয়া দলিল, জালিয়াতি ও প্রতারক চক্রের কারণে প্রবাসীরা তাঁদের রক্তঘামে অর্জিত পুঞ্জীভূত মূলধন হারান। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদন লাভ ও আইনি নথিপত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে অনেক প্রবাসী বিনিয়োগকারী হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন। যে প্রবাসীরা দেশের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় অংশীদার, নিজ ভূমিতেই তাঁদের এভাবে নিগৃহীত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সিলেটে প্রবাসীদের বিনিয়োগ যাতে কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয় এবং তাঁরা যেন কোনো ধরনের প্রতারণা বা হয়রানির মুখোমুখি না হন, তা নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় দায়িত্ব। প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দিতে এবং প্রয়োজনীয় সকল আইনি ও দাপ্তরিক সুযোগ-সুবিধা ত্বরান্বিত করতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (একক সেবাকেন্দ্র) চালু: প্রবাসীদের ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সব সেবা (যেমন: ট্রেড লাইসেন্স, জমি রেজিস্ট্রেশন, পরিবেশ ও ছাড়পত্র) দ্রুত ও ঝামেলামুক্তভাবে দিতে সিলেটে একটি বিশেষ 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' ডেস্ক কার্যকর করতে হবে।
২. প্রতারণা প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি ও আইনি সেল: জমি জালিয়াতি ও ভূয়া প্রকল্প তৈরি করে প্রবাসীদের প্রতারিত করার চক্রগুলোর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রবাসীদের আইনি সহায়তা ও অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় পর্যায়ে একটি বিশেষ 'লিগ্যাল হেল্প অ্যান্ড কমপ্লেন সেল' গঠন করা যেতে পারে।
৩. স্বচ্ছতা ও তথ্যের সহজলভ্যতা: প্রবাসীরা দেশের বাইরে থাকলেও যাতে অনলাইনে বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পের সঠিক তথ্য পেতে পারেন এবং স্থানীয় কোনো প্রকল্পের বৈধতা সহজেই যাচাই করতে পারেন, তার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জোরদার করা দরকার।
৪. সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা: শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে আগ্রহী প্রবাসীদের বিশেষ কর ছাড়, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগে অগ্রাধিকারসহ সরকার ঘোষিত সকল সুযোগ-সুবিধা আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্তভাবে প্রদান করতে হবে।
প্রবাসীরা কোনো অনুগ্রহের জন্য আসেন না; বরং তাঁরা দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে ও স্থানীয় বেকারত্ব দূর করতে নিজেদের পুঁজি বিনিয়োগ করতে আসেন। প্রবাসীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে সিলেটে দেশি-বিদেশি বড় বড় বিনিয়োগের দরজা খুলে যাবে, যা সমগ্র দেশের অর্থনীতিকেই নতুন গতি প্রদান করবে।
অতএব, প্রবাসীদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ যেন কোনো অসাধু চক্রের পেটে না যায় এবং তাঁরা যেন সম্মান ও সুরক্ষার সাথে সিলেটে তাঁদের বিনিয়োগ পরিচালনা করতে পারেন, সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন, শিল্প সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুরক্ষা প্রদান কেবল তাঁদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা নয়, এটি জাতীয় স্বার্থেরই অংশ।